চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে টেনে–হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। ছবি: ভিডিও থেকে পাওয়া
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক  হাসান মোহাম্মদকে টেনে–হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। ছবি: ভিডিও থেকে পাওয়া

শিক্ষক হেনস্তায় নিন্দা

‘সম্মতি ছাড়া জোর করে ধরে নেওয়া অপহরণ’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে হেনস্তার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এ ঘটনার বিচারও দাবিও উঠেছে।

ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আর রাজী প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে লেখেন, ‘সম্মতি ছাড়া কাউকে জোর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া অপহরণ। অপরাধী হলেও কোনো শিক্ষক বা কোনো মানুষকে জোরপূর্বক কোথাও নিয়ে যাওয়ার অধিকার কারও নাই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই।’

শিক্ষককে হেনস্তার ঘটনায় প্রতিবাদ জানান ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জি এইচ হাবীব। তিনি তাঁর ফেসবুকে হেনস্তার ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, ‘একজন শিক্ষক ও বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি এই আগ্রাসী ঘটনার তীব্র নিন্দা ও  প্রতিবাদ জানাই।’

জানতে চাইলে জি এইচ হাবীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সত্যতা থাকতে পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় এমন পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।’

চাকসুর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমানও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁর বিচার হওয়া প্রয়োজন। তবে যেভাবে চাকসু নেতারা তাঁকে আটক করেছেন, তা দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনলে একই সঙ্গে অভিযুক্ত অন্য শিক্ষকদের বিচারও নিশ্চিত করা যেত।’

জানতে চাইলে আইয়ুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নন। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে চাকসুর উচিত ছিল প্রশাসনের অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগ ও স্বজনপ্রীতির মতো বিষয়গুলোয় অবস্থান নেওয়া।

জাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিবৃতি

এ ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক মো. শামছুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অভিযোগ থাকলেও এভাবে কাউকে ধরে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। সে কারণেই তাঁরা বিবৃতি দিয়েছেন।’

জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের এক শিক্ষককে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে প্রকাশ্যে হেনস্তা, টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে সোপর্দ এবং সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া গভীর উদ্বেগজনক। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হুমকি। ভিন্নমত বা অভিযোগ থাকলেও এর নিষ্পত্তির একমাত্র পথ আইন ও প্রশাসনিক তদন্ত। কোনোভাবেই “মব জাস্টিস” নয়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে জয়লাভের পর ক্যাম্পাসে মব সংস্কৃতি ও শিক্ষক নিপীড়নের প্রবণতা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে পারবে না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

গতকাল শনিবার দুপুরে আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে চাকসুর কয়েকজন নেতা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে নিয়ে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একজনকে পেছন থেকে তাঁকে চেপে ধরতে দেখা যায়। সেখানে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার–বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে প্রক্টরের কার্যালয়ে নিয়ে ৭ ঘণ্টা, সহ-উপাচার্যের কার্যালয়ে ২ ঘণ্টাসহ মোট ৯ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ সময় শিক্ষকের মুঠোফোনেও তল্লাশি চালানো হয়। রাত ৯টার দিকে প্রক্টরের গাড়িতে করে তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নেওয়া হয়।

হাসান মোহাম্মদ আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের একাংশের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রক্টর। তিনি সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকাকালে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে ভূমিকা রেখেছেন বলে চাকসু নেতারা দাবি করেন। এ ছাড়া জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত চলছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ।