রাজশাহীতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। আজ শনিবার দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে
রাজশাহীতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। আজ শনিবার দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে

নুরুল হককে লাঠিপেটা: দেশজুড়ে মিছিল, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ

রাজধানীর কাকরাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ নেতা-কর্মীরা আহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এবং জাতীয় পার্টিকে (জাপা) নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কাকরাইলে জাপা ও গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জাপার কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণ অধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আহত নুরুল হকসহ ছয়জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এর প্রতিবাদে গতকাল রাতেই ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। ময়মনসিংহে জাপা কার্যালয় ভাঙচুর করেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। এ ছাড়া রাজশাহীতে জাপার জেলা ও মহানগর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

একই ঘটনার প্রতিবাদে আজ শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নুরুল হকের নিজ জেলা পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুমিল্লা, বরিশাল, টাঙ্গাইল, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও অবরোধ করা হয়েছে।

রাজশাহী: আজ বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় এক ঘণ্টা এই কর্মসূচি চলে। এতে মহাসড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। কর্মসূচি থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দুই দফা দাবি জানান—হামলায় জড়িত সেনা ও পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং জাপাকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে জানিয়ে দিতে চাই, আপনারা ছাত্র–জনতার রক্তের ওপর দিয়ে চেয়ারে বসেছেন। সেই চেয়ারে বসে যাঁরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।’

নুরুল হকের ওপর হামলার প্রতিবাদে পটুয়াখালীতে গণ অধিকার পরিষদের বিক্ষোভ মিছিল

পটুয়াখালী: নুরুল হকের নিজ জেলা পটুয়াখালী, গলাচিপা উপজেলা ও নুরের নিজ গ্রামে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা পৃথক সময়ে এসব কর্মসূচি করেন। এর আগে গতকাল রাত ১১টার দিকে এই তিন স্থানে মশালমিছিল ও বিক্ষোভ হয়।

আজ বেলা একটার দিকে গণ অধিকারের জেলা কার্যালয় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি লঞ্চঘাটে পৌঁছালে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন নেতা-কর্মীরা। বিকেল চারটার দিকে গলাচিপা উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়। এ ছাড়া গতকাল রাতে নুরের নিজ এলাকা গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ও চরকাজল ইউনিয়নে বিক্ষোভ হয়।

সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের গোলচত্বর থেকে উত্তরবঙ্গমুখী লেন হয়ে সায়দাবাদ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করে গণ অধিকার পরিষদ

সিরাজগঞ্জ: আজ বেলা ১১টা ৫০ থেকে ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের গোলচত্বর থেকে উত্তরবঙ্গমুখী লেন হয়ে সায়দাবাদ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। এ সময় যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের গোলচত্বর এলাকায় উত্তরবঙ্গমুখী লেন ১০-১৫ মিনিটের জন্য অবরোধ করা হয়। অবরোধ চলাকালে সড়কে টায়ারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করেন কর্মীরা। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে সায়দাবাদ এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে নেতা-কর্মীরা বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, নুরুলসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

যমুনা সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বিক্ষোভের কারণে ওই লেনে কিছু সময় যান চলাচলে ধীরগতি হলেও কোনো যানজট হয়নি।

নুরুল হকের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবিতে নীলফামারী শহরে বিক্ষোভ মিছিল

নীলফামারী: আজ দুপুরে নীলফামারী জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে গণ অধিকার পরিষদের জেলা শাখার আয়োজনে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করে অংশ নেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা।

গণ অধিকার পরিষদ নীলফামারী জেলা শাখার সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন এনসিপি নীলফামারী জেলা শাখার প্রধান সমন্বয়কারী মো. আব্দুল মজিদ, সদস্য মো. আখতারুজ্জামান, গণ অধিকার পরিষদ সৈয়দপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মনোয়ার হোসেন প্রমুখ। বক্তারা আওয়ামী লীগের দোসর জাপাকে নিষিদ্ধ এবং জি এম কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

এর আগে জেলা শহরের বড় বাজারে অবস্থিত দলীয় কার্যালয় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক অতিক্রম করে সমাবেশে মিলিত হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন।

হামলার প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লায় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। দুপুরে মহাসড়কের কুমিল্লা কোটবাড়ী বিশ্বরোড এলাকায়

কুমিল্লা: আজ দুপুর ১২টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় লেন অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। এ সময় তাঁরা মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দেন। এতে মহাসড়কে দুই দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা সরে গেলে বেলা ১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার মজুমদার আজ দুপুরে বলেন, বিক্ষোভের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে আনুমানিক ৩ কিলোমিটারজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। ২৫-৩০ মিনিট পর আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

কুমিল্লা জেলা গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সরকারের সঙ্গে সম্প্রীতির যে সম্পর্ক দেখিয়েছি, তারা সেটাকে দুর্বল মনে করেছে। এখন থেকে আর নয়। যেখানে সন্ত্রাসী হামলা হবে, সেখানেই আমরা লড়াই–সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’

নুরুল হকসহ দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বরিশালে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে গণ অধিকার পরিষদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি

বরিশাল: দুপুরে বরিশাল নগরের অশ্বিনীকুমার হলের সামনে বরিশাল জেলা ও মহানগর গণ অধিকার পরিষদ এবং এনসিপির উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। এরপর নেতা-কর্মীরা নগরীতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা জাপা, সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিরুদ্ধে এই হামলার অভিযোগ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার ভেঙে দিয়ে জাতীয় সরকার গঠন এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন তাঁরা।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, প্রথমে পুলিশ ও সেনারা তাঁদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালান। এরপর জাপাও এই হামলায় অংশ নেয়। ঘটনার সময় নুরুল হক মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর লাল টি-শার্ট পরা এক যুবক তাঁকে বেধড়ক মারধর করেন। এরপর ওই ব্যক্তিকে আটক করা হলেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এই ঘটনার দায়ে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন তাঁরা। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।

টাঙ্গাইলে গণ অধিকার পরিষদ জেলা শাখার নেতা–কর্মীরা জাতীয় পার্টির কার্যালয় ভাঙচুর করার পর ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের নগর জলফৈ মোড়ে অবরোধ করেন

টাঙ্গাইল: গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা আজ টাঙ্গাইলে জেলা জাপার কার্যালয় ভাঙচুর করেন। পরে তাঁরা ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করেন।

বেলা ১১টার দিকে টাঙ্গাইল জেলা গণ অধিকার পরিষদের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নিরালা মোড় পার হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানার পাশে জেলা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে গিয়ে হামলা চালায়। তারা কার্যালয়ের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। পরে মিছিল নিয়ে তাঁরা ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের নগর জলফৈ মোড় অবরোধ করেন। অবরোধের কারণে মহাসড়কে যানবাহনে আটকা পড়েন যাত্রী ও চালকেরা। প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ শেষে বেলা সোয়া একটার দিকে মহাসড়কের অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।

গাইবান্ধা শহরের কাঠপট্টি এলাকায় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা জেলা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে নেতা-কর্মীরা সড়কে বসে নানা স্লোগান দিতে থাকেন

গাইবান্ধা: আজ বেলা ১১টার দিকে গাইবান্ধা শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে থেকে বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বেলা তিনটার দিকে গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা একত্র হয়ে শহরের কাঠপট্টি এলাকায় জেলা জাপার অফিসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় কাঠপট্টি সড়কের প্রবেশমুখে পুলিশ বাধা দেয়। এতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা সড়কের ওপর বসে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেয়। সরকার তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে অন্যায়ভাবে কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে। গাইবান্ধা সদর ওসি শাহিনুর রহমান বলেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এড়াতে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়।