
বান্দরবানের রোয়াংছড়ির শুকনাছড়িপাড়ায় তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা সরকারি সহায়তা ছাড়াই নিজেদের উদ্যোগে প্রায় দুই কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে পাহাড়ি ঝরনা থেকে পানি এনেছেন। এতে নারীদের কষ্ট কমেছে। পানির সংকট দূর হয়েছে। পানি ছাড়াও তাঁরা নিজেরাই রাস্তা, বিদ্যালয় ও বৌদ্ধবিহার গড়ে তুলে পাড়াকে স্বনির্ভর করেছেন।
ঘরের উঠানে কলসিতে পানি ভরতে ভরতে ৬১ বছরের নারী বিনতি বালা তঞ্চঙ্গ্যা বললেন, ‘এই শুকনাছড়িপাড়ায় এখন ঘরের আঙিনায় পানি দেখছেন, পাঁচ বছর আগেও এখানে পানির জন্য হাহাকার ছিল। আর এই পানি কেউ এনে দেয়নি। আমরা পাড়াবাসী নিজেরা পাইপলাইন বসিয়ে পাড়ায় এনেছি। সরকার কিছুই করেনি।’
বিনতি বালার কথাই সত্যি। শুকনাছড়িপাড়ার নারীরা এখন বাড়ির আঙিনা থেকেই পানি সংগ্রহ করতে পারেন। কয়েক ঘণ্টা দূরের পাহাড়ি পথে হেঁটে গিয়ে ঝিরি-ঝরনা থেকে তাঁদের পানি সংগ্রহ করতে হয় না। বয়স্ক, শিশুসহ পাড়াবাসীরা যখন মন চায় গোসল করতে পারেন। পাঁচ বছর আগেও পানির অভাবে সপ্তাহের সব দিন গোসলের সুযোগ মিলত না তাঁদের।
বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে শুকনাছড়িপাড়ার অবস্থান। পাহাড় ঘেরা দুর্গম এই গ্রামে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছায়নি। পাড়ার ৩৫টি পরিবারের সবাই তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের। ফলের বাগান ও জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল পাড়াবাসী।
সম্প্রতি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, টিলার ওপর গড়ে ওঠা পাড়ায় বাঁশের তৈরি খুঁটির ওপর ছোট ছোট মাচাং ঘর। এক পাশে কাঠের তৈরি একটি বৌদ্ধবিহার। পাড়ার দুটি জায়গায় ও বৌদ্ধবিহারে বসানো হয়েছে পানির ট্যাংক। ওই তিন স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করেন পাড়ার বাসিন্দারা।
শুকনাছড়িপাড়ায় এই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গ্রামবাসীর শ্রমে ও মেধায় তৈরি। গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন শিশুদের স্কুল, চলাচলের সংযোগ সড়ক ও বৌদ্ধবিহার। পাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যার ভাষায়, তাঁদের পাড়া পুরোপুরি স্বনির্ভর। সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই এখানে পানি ব্যবস্থাপনা, রাস্তা, স্কুল গড়ে উঠেছে।
নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যা আরও বলেন, অতীতে পাহাড়ের পাড়াগুলো কোনো কিছুর জন্য কারও ওপর নির্ভর করত না। সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে শুকনাছড়িপাড়া।
পাড়াবাসীর উদ্যোগে বৌদ্ধবিহারের জায়গায় কলাবাগান করা হয়েছে। পাড়ার পূর্ব পাশে ২০ একরের পাড়া বনে (প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত পাড়া রিজার্ভ) প্রচুর বাঁশ আছে। বাগানের কলা ও পাড়াবনের বাঁশ বিক্রি করে প্রায় চার লাখ টাকা পাওয়া গেছে। সেখান থেকে দেড় লাখ টাকার পানি সরবরাহের পাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। অবশিষ্ট টাকায় বৌদ্ধবিহারের জন্য একটি আধা পাকা ভোজনশালা নির্মাণ করা হয়েছে। সেটিই বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যা, কার্বারি, শুকনাছড়িপাড়া, রোয়াংছড়ি
যেভাবে পানির কষ্ট দূর হলো
আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও শুকনাছড়িপাড়ায় পানির তীব্র সংকট ছিল। পাড়ার বাসিন্দা কান্দরি তঞ্চঙ্গ্যা ও চঞ্চনা তঞ্চঙ্গ্যা প্রথম আলোকে বলেন, পাড়া থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার নিচে তুলাছড়ি নামে ছোট একটি খাল আছে। পাহাড় থেকে নেমে তুলাছড়িখাল থেকে পানি নিয়ে মাথায় করে পাড়ায় আসতে আসতে সব কর্মশক্তি শেষ হয়ে যেত। এভাবে দৈনন্দিন পানি সংগ্রহ করতে নারীদের দিনে দুই-তিন ঘণ্টা সময় চলে যেত। বয়স্ক ও শিশুদের পক্ষে ঝরনায় গিয়ে সপ্তাহের সব দিন গোসল সারা সম্ভব হতো না। পাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি তিবাধন তঞ্চঙ্গ্যা জানালেন, পাড়াটি ৪৫ বছর আগে গড়ে তোলার সময় থেকে পানির সমস্যা ছিল। এ ছাড়া প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পানির সংকট আরও বাড়ে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পাড়ায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির জন্য আট লাখ টাকার প্রকল্পও তৈরি করেছিল। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলে জানান পাড়ার কুণ্ডলাল তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের প্রকৌশলীরা পাড়ায় ঘুরে গিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকার প্রকল্পও তৈরি করেছিলেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। এরপর পাড়াবাসী প্রায় দুই কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে হাজাছড়া থেকে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করে। পাড়ার প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে জনবল দিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মাটি কেটে পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। কোথাও পাইপলাইন নষ্ট হয়ে পানি বন্ধ হলে পাড়াবাসী নিজেরা পালাক্রমে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন।
পানি সরবরাহের পাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম কীভাবে কেনা হয়েছে, জানতে চাইলে কার্বারি নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যা জানালেন, পাড়াবাসীর উদ্যোগে বৌদ্ধবিহারের জায়গায় কলাবাগান করা হয়েছে। পাড়ার পূর্ব পাশে ২০ একরের পাড়া বনে (প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত পাড়া রিজার্ভ) প্রচুর বাঁশ আছে। বাগানের কলা ও পাড়াবনের বাঁশ বিক্রি করে প্রায় চার লাখ টাকা পাওয়া গেছে। সেখান থেকে দেড় লাখ টাকার পানি সরবরাহের পাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। অবশিষ্ট টাকায় বৌদ্ধবিহারের জন্য একটি আধা পাকা ভোজনশালা নির্মাণ করা হয়েছে। সেটিই বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। নতুন ঘর না ওঠা পর্যন্ত সেখানেই বিদ্যালয় চলবে। এ ছাড়া রোয়াংছড়ির প্রধান সড়ক থেকে নিজেদের পাড়া পর্যন্ত গাড়ি চলাচলের দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়ক নির্মাণ করেছেন গ্রামবাসী।
পাড়ার এক পাশে বাঁশের বেড়ার ঘর, এখনো ছাউনি দেওয়া হয়নি সেখানে। সেটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি রঞ্জিত তঞ্চঙ্গ্যা জানিয়েছেন, ঢেউটিন কিনতে না পারায় বিদ্যালয়টির ছাউনি দেওয়া যাচ্ছে না। তাই বৌদ্ধবিহারের একটি ঘর বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবার বিদ্যালয়ের জন্য ৫০০ টাকা করে চাঁদা দেন। তবে যাঁদের ঘরে শিক্ষার্থী নেই, তারা ১০০ টাকা করে সহায়তা দেন। ওই টাকায় বিদ্যালয়টি পরিচালনা করা হয় বলে জানালেন পাড়ার কার্বারি নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যা।
রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লা অং মারমা জানিয়েছেন, শুকনাছড়িপাড়ার মানুষ খুবই ঐক্যবদ্ধ। তাঁরা সরকার থেকে কিছু পাওয়ার আশায় থাকেন না। নিজেদের সেবার অবকাঠামো নিজেরা তৈরি করে সব সময় স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার চেষ্টা করেন।
রোয়াংছড়ির উপজেলা প্রকৌশলী তুহীন বিশ্বাস জানিয়েছেন, শুকনাছড়িপাড়ার মানুষ আবেদন করলে তাঁদের স্থাপিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণে সহযোগিতা করা হবে।