
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম। গ্রামসংলগ্ন ঝামারবালি দক্ষিণ চর হাওরে পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। গতকাল শনিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটতে যান তিনি। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে জমির ধান তলিয়ে গেছে। পানি দেখে শ্রমিকেরা চলে যান। চোখের সামনে ফসল তলিয়ে যাওয়া দেখে জমিতেই অচেতন হয়ে পড়েন নজরুল।
নজরুল ছাড়াও পাশের রামপুরা গ্রামের আহাদ মিয়া (৫৫) গতকাল সকালে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটতে গিয়ে জমি তলিয়ে যেতে দেখেন। কষ্ট সইতে না পেরে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে জমিতেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নজরুল-আহাদের মতো নাসিরনগর উপজেলার হাজারো কৃষকের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, অতিবৃষ্টিতে হাওরে পানি জমে নাসিরনগর উপজেলার প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির ধান এখন পানির নিচে। এতে ৮০০ থেকে ১ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে উপজেলা কৃষি কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করলেও গোয়ালনগর ইউনিয়নের কোনো কৃষকের নাম নেই। কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, দুই ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা নির্দেশ দেওয়ায় সব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরে ওই ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় যুক্ত করা হবে।
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জমি গাঙের (নদীর) পাড়। চার-পাঁচ মুনি (শ্রমিক) নিয়ে গেছি। জমিতে পানি দেখে তাঁরা চলে গেছে। চোখের সামনে পাঁচ কানি জমি পানির নিচে দেখে আমি অচেতন হয়ে পড়ি। পুরো হাওর পানির নিচে। একমুঠো ধান যে বাড়িতে আনব, তার কোনো সুযোগ নাই। ধান কাইটা চরের ওপর রাখছি, বৃষ্টিতে ভিজজা পইচা গেছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগরে মোট আবাদ ১৭ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। মোট ৫৫ হাজার কৃষক ধান চাষ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২ থেকে ২টার মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে পাঠানো নির্দেশ দেওয়া হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ কৃষকের নাম সংযুক্ত করে তালিকা পাঠিয়েছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষকের নাম তালিকায় আসেনি।
গোয়ালনগর ইউনিয়নের কৃষকেরা জানান, সোনাতলা, গুরুহাজা, কাতলাপুর, দলিয়াবিল, সেতারি, মধ্যকান্দা, পুরাকান্দা, নেলিখ্যা, খারি, ঝামারবালি, খাসের চর, বলাচর, বন্দের বিল, দক্ষিণ চর ও কদমতলী বিল বা হাওর আছে। সোনাতলার প্রায় ৩০০ কৃষকের প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি, ঝামারবালির শতাধিক কৃষকের প্রায় এক হাজার বিঘা জমি ও কদমতলীতে ২০০ থেকে ৩০০ কৃষকের এক থেকে দেড় হাজার বিঘা জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
সোনাতলার কৃষক মুরাদ মিয়া বলেন, ‘কষ্টের কথা কী কমু। বৃষ্টি আর ঠান্ডা বাতাস। দুই কানি জমির ধান আট দিন ধরে পানির নিচে। মায়া লাগে, তাই ধান কাটতে আইছি। শুকাইয়া খাইতে পারলে খামু, নাইলে ফালাইয়া দিমু। আমি ছোট কৃষক, যারা বড় কৃষক, তাদের আরও বেশি জমি পানির নিচে গেছে গা।’
গোয়ালনগর গ্রামের কৃষক খলিল মিয়া বলেন, ‘১০ কানি (৩০ শতকে এক কানি) জমিতে ধান করছি। দুই কানি জমির ধান কাইটা খলায় শুকানোর জন্য রাখছি। সেই ধানও নীল হইয়া গেছে। খলায় রাখা ধানও বৃষ্টিতে ভিজে পচে যাচ্ছে। বাকি আট কানি জমির ধান পানির নিচে তলিয়েছে। ধানের ওপর এক হাত পানি। এই ধান আর তোলা যাবে না।’
গতকাল শনিবার নাসিরনগরের ভলাকুট থেকে নৌকায় গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতুলা গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাউকে বুকসমান পানিতে নেমে আবার শ্রমিকদের কোমরপানিতে নেমে ধান কাটতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বৃষ্টিতে ভিজে জমি থেকে কাটা ধান মাথায় বোঝাই করে খলায় রাখছেন। খলায় সেই ধানের স্তূপ। সবই বৃষ্টির পানিতে ভিজে পচে যাচ্ছে।
কৃষক নাসির মিয়া বলেন, ‘আমি এই বছর কাঁচি হাতে নিচ্ছি। কারণ, আমার সব সম্পদ তলাইয়া গেছে। পুলাপাইন লইয়া কেমনে দিন কাটামু এই অবস্থা নাই। ১৫ কানি খেত পিনির নিচে গেছে গা। যেটি কাটছি গেরা আইয়া পড়ছে, খলায় পচতাছে। দুই লাখ টেহা খরচ হইছে, এবার কুছতাই পাইতাম না।’
গোয়ালনগর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য মোছা. তাসলিমা বেগম বলেন, কদমতলী, মাইজখোলা, সোনাতলায় ৪০০ থেকে ৫০০ কানি জমি তলিয়ে গেছে। যেসব ধান খলায় শুকানোর জন্য আনা হয়েছিল, সেগুলোও বৃষ্টিতে ভিজে পচন ধরছে। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর অনুরোধ, তাঁর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম যেন তালিকায় থাকে।
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টিতে উপজেলার ৩০০ হেক্টর জমি বর্তমানে পানির নিচে। এতে ৮০০ থেকে ১ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে দুই ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দিতে নির্দেশনা দেয়। যত দূর করতে পেরেছেন, তালিকা করে পাঠিয়েছেন। সময়স্বল্পতার কারণে গোয়ালনগরসহ সব জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। তবে জমা দেওয়ার সময় বলা হয়েছে, তালিকাটি অসম্পূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রক্রিয়াধীন। তাদের জন্য বরাদ্দ চেয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে। বৃষ্টির পানি নাকি উজানের পানি বোঝা যাচ্ছে না। তবে হবিগঞ্জের লাখাই দিয়ে সুনামগঞ্জের পানি ঢুকতে পারে।