কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর ৬ নম্বর জেটিঘাটের একটি ভাসমান পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সম্প্রতি তোলা
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর ৬ নম্বর জেটিঘাটের একটি ভাসমান পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সম্প্রতি তোলা

জ্বালানি তেলের সংকট

কক্সবাজারে ৪ হাজার নৌযানে মাছ ধরা বন্ধ, পর্যটকদেরও দুর্ভোগ

কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে মাছ ধরার প্রায় চার হাজার নৌযান সাগরে যেতে পারছে না। এতে স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহও কমে গেছে। এদিকে জ্বালানি–সংকটের কারণে জেলা শহরের হোটেল-মোটেলগুলোতে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। এতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে পর্যটন নগর কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের।

জেলার ৯টি উপজেলায় জ্বালানি সরবরাহের ৩২টি পাম্প রয়েছে। এ ছাড়া ভাসমান পাম্প রয়েছে ২১টি। এর মধ্যে শহরের বাইরের পাম্পগুলোতে বর্তমানে পেট্রল নেই। অকটেন-ডিজেলও শেষের পথে। পাম্পের মালিকেরা জানান, চাহিদার তুলনায় অনেক কম জ্বালানি সরবরাহ করছে রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলো। জেলায় প্রতিদিন জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ১২ লাখ লিটার। এর বিপরীতে মিলছে ৪ লাখ লিটারের মতো। ফলে গ্রাহকদের চাহিদামতো জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার ক্যাপ্টেন কক্স-ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তেলের সংকটের কারণে পাম্পে জ্বালানি সরবরাহের একটি যন্ত্র (মেশিন) বন্ধ রাখা হয়েছে। পাম্পটিতে দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেলের জন্য ২০০ টাকার জ্বালানি পেয়েছেন শহরের লিংকরোড এলাকার বাসিন্দা আবুল মনজুর। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি প্রথম আলোকে জানান, তাঁর ডিমের ব্যবসা রয়েছে। ব্যবসার কারণে শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরের উখিয়া সদরের পোলট্রি ফার্মে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়। মাত্র ২০০ টাকার অকটেন দিয়ে সেখানে আসা-যাওয়া করা সম্ভব নয়। একটি প্রাইভেট কারের মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে ১ হাজার টাকার অকটেন পেলাম। এই জ্বালানিতে চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে না।’

পাম্পমালিকদের দেওয়া তথ্য মতে, শহরের চারটি পাম্পে প্রতি সপ্তাহে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ লিটার। মজুত আছে প্রায় ১৫ হাজার ২৮৮ লিটার, পেট্রলের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার লিটার, মজুত রয়েছে প্রায় ৬ হাজার লিটার; ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৮৪ হাজার লিটার, আছে প্রায় ৩০ হাজার লিটার।

শহরের পানবাজার এলাকার ভোলা বাবুর পেট্রলপাম্প, উপজেলা পরিষদ–সংলগ্ন আশরাফ আলী সন্স অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনেও মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কম জ্বালানি সরবরাহ করায় সেখানে অনেককে হইচই শুরু করতে দেখা যায়।

কক্সবাজার শহরের চারটি পাম্পে সীমিত পরিমাণ পেট্রল মজুত থাকলেও জেলার অপর সাত উপজেলা রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, উখিয়া ও টেকনাফে পেট্রলের কোনো মজুত নেই বলে জানান পাম্পের মালিকেরা।

জ্বালানি–সংকটের কারণে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহন চালকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই পর্যটকসহ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন।

জেলার ৯টি উপজেলায় মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৬ হাজারের মতো। শতভাগ ট্রলার ডিজেলচালিত। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অন্তত ৪ হাজার ট্রলারের মাছ আহরণ বন্ধ রয়েছে। যে পরিমাণ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে উপকূল থেকে সাগরের ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের বেশি গভীরে পৌঁছানো যায় না। মাছ ধরতে হলে ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে জাল ফেলতে হয়।
দেলোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক,  কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতি।

পাম্পের মালিকদের দেওয়া তথ্য মতে, শহরের চারটি পাম্পে প্রতি সপ্তাহে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ লিটার। মজুত আছে প্রায় ১৫ হাজার ২৮৮ লিটার, পেট্রলের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার লিটার, মজুত রয়েছে প্রায় ৬ হাজার লিটার; ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৮৪ হাজার লিটার, আছে প্রায় ৩০ হাজার লিটার।

জ্বালানি–সংকটে বন্ধ নৌযান

টেকনাফে সাগরে মাছ আহরণের রঙিন ডিঙি নৌকা আছে পাঁচ শতাধিক। কয়েক দিন ধরে দুই শতাধিক নৌকা ঘাটে পড়ে আছে। কয়েকটি নৌকার জেলেরা জানান, সাগরে এমনিতে মাছ নেই, এর ওপর জ্বালানি–সংকট। তাই অনেকেই মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। নৌকাগুলো ডিজেলচালিত ইঞ্জিনে চলে।

পাম্পে জালানি নিতে আসা মোটরসাইকেলের সারি। সম্প্রতি কক্সবাজার শহরে

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীতে নোঙর করে আছে হাজারো ট্রলার। নদীর মাঝির ঘাট, নুনিয়াছটা, ৬ নম্বর জেটিঘাট এলাকাসহ অন্যান্য উপকূলে ২১টি ভাসমান পাম্প রয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে ৯০ শতাংশ পাম্পে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ। পাম্পগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে সাগরে নামে অন্তত ৪ হাজার মাছ ধরা নৌযান। ৬ নম্বর জেটিঘাটের ফারিয়া ট্রেডিং করপোরেশনের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, তাঁদের পাম্পে প্রতিদিন ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। তবে সাত দিন ধরে জ্বালানি নেই।

কক্সবাজার ফিশিং বোটমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সদর, পেকুয়া, চকরিয়াসহ জেলার ৯টি উপজেলাতে মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৬ হাজারের মতো। শতভাগ ট্রলার ডিজেলচালিত। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অন্তত ৪ হাজার ট্রলারের মাছ আহরণ বন্ধ রয়েছে। যে পরিমাণ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে উপকূল থেকে সাগরের ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের বেশি গভীরে পৌঁছানো যায় না। মাছ ধরতে হলে ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে জাল ফেলতে হয়।’

উপকূলীয় এলাকায় যোগাযোগ বিঘ্নিত

কক্সবাজার শহর থেকে মহেশখালীতে যাত্রী পরিবহন করে  দেড় শতাধিক স্পিডবোট। বাঁকখালী নদীর ভাসমান পাম্প থেকে পেট্রল কিনে সাগর চ্যানেল পাড়ি দেয় এসব নৌযান। তবে পেট্রল সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৮০ শতাংশ স্পিডবোটের চলাচল বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগ বেড়েছে যাত্রীদের।

পেকুয়া থেকে কুতুবদিয়া যাতায়াতের ২০টির বেশি স্পিডবোট ও টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাতায়াতের অর্ধশতাধিক স্পিডবোটের চলাচলও জ্বালানি–সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে। উপকূলীয় উপজেলা কুতুবদিয়াতে পাম্প নেই। নৌপথে চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি এনে দ্বীপের চাহিদা মেটানো হয়।

কক্সবাজার স্পিডবোট মালিক সমিতির নেতা দিদারুল  ইসলাম বলেন, কক্সবাজার-মহেশখালী নৌরুটে প্রতি ট্রিপে একটি স্পিডবোটের পেট্রল লাগে প্রায় ৮ লিটার। আগে দৈনিক ১০ লিটার করে দেওয়া হতো। এখন পেট্রল মিলছে না। ফলে অনেক স্পিডবোটের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

দুর্ভোগে পর্যটক

কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। লোডশেডিং যখন চলে তখন শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। তবে ডিজেলের সংকটে এখন বেশির ভাগ হোটেল অন্ধকারে থাকছে। যার কারণে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে গত তিন দিনে সাড়ে তিন লাখ পর্যটক সৈকত ভ্রমণে এসেছেন। ২৯ মার্চ পর্যন্ত ১০ লাখ পর্যটক আশা করা হচ্ছে।

কক্সবাজার জিপ-মাইক্রো মালিক সমিতির সভাপতি মো. শাহজাহান বাপ্পি বলেন, সৈকত ভ্রমণে আসা ৯০ শতাংশ পর্যটক জিপ-মাইক্রো-অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে টেকনাফ, রামু বৌদ্ধ পল্লি, চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কসহ দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরতে যান। জ্বালানি–সংকটের কারণে বেশির ভাগ যানবাহনের চলাচল বন্ধ রয়েছে।

পর্যটক নিয়ে কক্সবাজার শহরে আসা কয়েক হাজার বাস-মাইক্রো-কারের চালকেরাও জ্বালানি–সংকটে রয়েছেন বলে জানান কক্সবাজার জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) রফিকুল ইসলাম মিয়াজি। তিনি বলেন, দূরপাল্লার বাসে জ্বালানি সংগ্রহ করতে একাধিক পাম্পে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সারা দেশে জ্বালানির সংকট চলছে। সংকটকালীন মুহূর্তে জ্বালানি তেল যেন চোরাইপথে মিয়ানমারে পাচার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।’