কিশোরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশু তুহিনের বাবা পুলিশ কনস্টেবল শামসুল হক
কিশোরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশু তুহিনের বাবা পুলিশ কনস্টেবল শামসুল হক

সেই পুলিশ সদস্য বললেন, ‘কে জানত নিথর শিশু আমার নিজেরই আদরের সন্তান’

‘হঠাৎ ওসি স্যার ফোন দিয়ে বলেন, “সার্কিট হাউসের দিকে একটি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে, টহল পুলিশ নিয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছাও।”’ নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই সেখানে ছুটে যাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে নিজের চোখকেই যেন নিজে বিশ্বাস করতে পারছি না। কে জানত নিথর শিশু আমার নিজেরই আদরের সন্তান। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের ছেলের এমন করুণ মৃত্যু দেখতে হবে, সেটা কখনো কল্পনা করিনি। এই কষ্ট কাউকে বলে বোঝাতে পারব না, কলিজা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার ওপর তো কারও হাত নেই। কী আর করব?’

অতিকষ্টে কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশু মোহাম্মদ তুহিনের (১০) বাবা পুলিশ সদস্য শামসুল হক। আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা শহরের জনতা স্কুল রোড এলাকায় সিমেন্টবোঝাই ট্রাকের চাপায় মারা যায় তাঁর ছেলে। সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দায়িত্ব পালনে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিল কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানা–পুলিশের একটি টহল দল। ওই দলে গাড়িচালক ছিলেন শামসুল হক।

নিহত তুহিন গাইটাল জনতা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্কুলের পাশেই ভাড়া বাসায় বাবা–মা ও আরও দুই ভাইয়ের সঙ্গে থাকত সে। ভাইদের মধ্যে তুহিন ছিল মেজ। তাদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা সদরে।

পুলিশের ওই টহল দলের নেতৃত্বে ছিলেন উপপরিদর্শক ফজলে রাব্বি। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক। দুর্ঘটনার খবর পেলেই বিভিন্ন জায়গায় ছুটে যাই আমরা। চালক শামসুল হকই নিয়ে যান আমাদের নিয়ে। তবে এবার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের। ঘটনাস্থলে গিয়ে যখন দেখলাম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার শিশুটি আমাদের সঙ্গে যাওয়া গাড়ি চালক শামসুল হকের ছেলে। তখন তাঁকে কী বলে যে সান্ত্বনা দেব, ভাষা আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শুধু আমরা না, ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনও এ ঘটনায় খুবই মর্মাহত হয়ে শামসুল হককে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে গাইটাল এলাকার বাসা থেকে সাইকেল নিয়ে জনতা স্কুল রোড এলাকায় ঘুরতে বের হয় তুহিন। এ সময় একটি সিমেন্টবোঝাই ট্রাক চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম ভূঞা জানান, তুহিনের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছে। সেখানে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। তবে ট্রাকের চালক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্বজনেরা জানান, জুমার নামাজের পর কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনসে তুহিনের প্রথম জানাজা হয়। এরপর মরদেহ নেত্রকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।