শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনায় বন্ধু, সহপাঠীদের সঙ্গে সেলফি তুলছে এক অংশগ্রহণকারী। প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাইস্কুল প্রাঙ্গণ, ময়মনসিংহ। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনায় বন্ধু, সহপাঠীদের সঙ্গে সেলফি তুলছে এক অংশগ্রহণকারী। প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাইস্কুল প্রাঙ্গণ, ময়মনসিংহ। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আট কিলোমাটার দূরের স্কুলে যেতে হাঁটতে হতো দুই কিলোমিটার, সাফল্যের গল্প শোনাল নাহিয়ান

বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে প্রায় আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো, দুই কিলোমিটার ছিল হেঁটে যাওয়ার পথ। স্কুল ও প্রাইভেট শেষে ক্লান্ত থাকলেও পড়তে বসলে সেই ক্লান্তি ভুলে যেত। পরীক্ষার কিছুদিন আগে অসুস্থও হয়ে পড়েছিল। জিপিএ-৫ পাওয়ার পথটা এত সহজ ছিল না।

আজ শুক্রবার ময়মনসিংহের প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাইস্কুলে আয়োজিত শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনায় নিজের সাফল্যের পেছনে এমন সংগ্রামের কথা জানাল তারাকান্দা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী নাহিয়ান আহমেদ।

শুধু তা–ই নয়, নিজের পছন্দের বিভাগ পেতেও বেগ পেতে হয়েছে। নাহিয়ানের কথায়, ‘নতুন কারিকুলামে নবম থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার সময় আমি ইংরেজিতে ফেল করি। এ কারণে শিক্ষকেরা আমাকে বিজ্ঞান বিভাগে দিতে চাননি। কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে বিজ্ঞান বিভাগ নিই। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে বিজ্ঞান বিভাগের সব বিষয়ে ভালো নম্বরসহ জিপিএ-৫ পেয়েছি।’

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান

শ্যামগঞ্জের জেনুইন মডেল স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া রুবাইয়া রহমানের সংগ্রামটা ছিল অবশ্য অন্য রকম। ২০১৪ সালে যখন বাবা মারা যান, তখন সে প্লেতে পড়ে। এরপর টিউশনি করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। রুবাইয়া বলল, ‘সমাজের অনেকেই বাধা দিতে চেয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, মেয়েদের সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দরকার নেই। সব চড়াই-উতরাই পার করেই আমি এ পর্যন্ত এসেছি।’

নাহিয়ান ও রুবাইয়াদের মতো কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিতে প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস

এ সংবর্ধনার ময়মনসিংহ পর্বের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় আজ সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বক্তব্য পড়ে শোনান।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ময়মনসিংহ কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ মো. এখলাছ উদ্দিন খান বলেন, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। এসএসসি থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তাই এখন থেকেই শিক্ষার্থীদের আরও সচেতন ও পরিশ্রমী হতে হবে।

বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননাপ্রাপ্ত নাছিমা আক্তার সময়ের সঠিক ব্যবহার ও পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সফল ও ব্যর্থ—উভয়ের জন্যই দিনে ২৪ ঘণ্টা সময় থাকে। পরিশ্রম করার কোনো বিকল্প নেই।

২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন’ বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ পুরস্কার পাওয়া নুরুন নাহার আক্তার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি যার যে বিষয়ে আগ্রহ ও দক্ষতা রয়েছে, সেটি বিকশিত করতে হবে।

প্রথম আলোর হেড অব ডিপ নিউজ রাজীব আহমেদ শিক্ষার্থীদের ছাত্রজীবনে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়ার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন, ‘এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অনেক কাজ করে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে কোন পেশা কতটা টিকে থাকবে, তা নিশ্চিত নয়। তাই তোমাদের চ্যালেঞ্জ হবে এআইয়ের চেয়ে ভালো কিছু করা।’

শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শপথ পড়ানো হয়

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মাহবুবা খাতুন, কলেজশিক্ষক মাহমুদা নাছরিন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আসা অভিভাবক ফাহিমা ইসলাম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শপথ পড়ান প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. চান মিঞা। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর মেন্টর মো. সাইদুর রহমান, সজিব শিকদার ও রায়হান এ আর খান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ময়মনসিংহ বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি নাহিদ মন্ডল ও বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন।

সাংস্কৃতিক পর্বে ময়মনসিংহ বন্ধুসভার বন্ধু ইয়াসিন আল আরিয়ান ও রুমা আক্তার নীড় দ্বৈতনৃত্য পরিবেশন করেন। ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাদিকুর রহমান শাওনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা সবাইকে মাতিয়ে রাখে। অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান ময়মনসিংহ বন্ধুসভার সভাপতি মেহেদি হাসান।

কুইজ বিজয়ী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় বই

‘তিন প্রজন্মের হাতে প্রথম আলো’

সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে মা জান্নাতুল ফেরদৌসকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হন জামালপুর শহরের নয়াপাড়া এলাকার শিক্ষার্থী প্রিন্স রহমান। ট্রেনে ময়মনসিংহে আসেন তাঁরা। সংবর্ধনায় আসতে পেরে উচ্ছ্বসিত প্রিন্স প্রথম আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল, তাঁর দাদু জীবিত থাকাকালে প্রতিদিন সকালে প্রথম আলো পড়তেন। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম আলোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এখন বাবার সঙ্গে প্রিন্সও নিয়মিত প্রথম আলো পড়ে।

নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থী এরিন আলম, তাবাসসুম সাদিয়া, সামিহা জাহান, মাহিয়া আকন্দ, ফাহিমাতুল জান্নাত ও সামিয়া ইসলাম এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। প্রায় এক মাস পর ছয় বান্ধবীর দেখা হয়। এরিন বলল, ‘আগের বছরগুলোর সংবর্ধনার কথা শুনেছি। এবার নিজেরা এই সংবর্ধনায় অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে।’

গৌরীপুর উপজেলার ইউসুফাবাদ গ্রামের হুমায়রা তাবাসসুম মায়ের রান্না করা গরম ভাত খেয়ে বাবা হেলাল উদ্দিনের মোটরসাইকেলে করে অনুষ্ঠানস্থলে আসে। গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গৌরীপুর সদরে হেঁটে গিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া ও প্রাইভেট পড়ার কষ্টের কথা উল্লেখ করে সে বলল, সেই পরিশ্রমের ফল হিসেবে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তবে সংবর্ধনায় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় কিছুটা হতাশ গফরগাঁওয়ের তাসফিয়া নওশিন। ট্রেন ছাড়তে দেরি করায় শিক্ষক বাবা শাহ মোহাম্মদ আকবর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে তাসফিয়া যখন অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায়, ঘড়িতে তখন দুপুর ১২টা ১৭ মিনিট। ততক্ষণে প্রায় সবাই অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে গেছে। শেষ বেলায় এসেও অনুষ্ঠানস্থল ঘুরে দেখে ও ক্রেস্ট পেয়ে খুশি সে।