
সুকুমার রায় তাঁর ‘পাকাপাকি’ কবিতায় বলেছেন, ‘আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে’। তবে এখন আর শুধু বৈশাখে নয়, আম পাকে সারা বছর। আসছে কার্তিক মাসেও আম পাকবে। তখন পাওয়া যাবে কাটিমন আম।
বছরে একাধিকবার ফলন দেওয়া এই জাতের আমের বাণিজ্যিক চাষাবাদ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে। সাধারণত নতুন জাত এলে নতুন বাগান হয়, কিন্তু এ জাতের ক্ষেত্রে তা হয়নি। চাষিরা অন্য জাতের বড় গাছকে ‘গ্রাফটিং’ (কলম করা) করে কাটিমনে বদলে ফেলছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই আমের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে এখন কাটিমন চাষ হচ্ছে। রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর আমবাগানের মধ্যে কাটিমন হয়েছে ২৪২ হেক্টরে। নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর আম চাষের জমির মধ্যে কাটিমন রয়েছে ১৬০ হেক্টরে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর মৌজায় সাত বিঘার একটি বাগানে এখন কাটিমনের চাষ। বাগানের পুরোনো বড় গাছগুলোর অনেকগুলোই গ্রাফটিং করে কাটিমনে রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি বড় গাছগুলোর ফাঁকে লাগানো হয়েছে নতুন কাটিমনের চারা।
সম্প্রতি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ছোট ছোট কাঁচা আম। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে আমে ফ্রুট ব্যাগ পরানোর কাজ চলছে। বাগানের নতুন গাছগুলোর বয়স সাড়ে তিন বছর। এই মৌসুমেই প্রথমবার সেসব গাছ থেকে ফল নেওয়া হবে। কার্তিকের শুরুতেই, এমনকি দু–চার দিন আগেও এসব গাছের আম পাকতে শুরু করবে। আমচাষি ও ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন, মো. রেমন খান, আবদুস সবুর, মাহমুদুল হাসান ও আকমল মাহমুদ ইজারা নিয়ে এই বাগানে কাটিমন জাতের আম চাষ করেছেন।
বাগানের ইজারাদারদের একজন মাহমুদুল হাসান বলেন, সাত বিঘার বাগানে পুরোনো বড় গাছ আছে ৭০টি। নতুন কাটিমনের চারা লাগানো হয়েছে ৩০০টি। ছোট গাছগুলোকে বেশি বড় হতে না দিয়ে নিয়মিত ডাল ছাঁটাই করার পরিকল্পনা তাঁদের। তাতে নতুন পাতা গজাবে। নতুন নতুন ডালে আমও বড় হবে।
বাগানটিতে আগে লকনা, গোপালভোগ, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের আমগাছ ছিল। বেশির ভাগ গাছের বয়স প্রায় ১৫ বছর। সেই গাছগুলোর কয়েকটিকে গ্রাফটিং করে কাটিমনে রূপান্তর করা হয়েছে।
বাগানের অংশীদার সাহাবুদ্দিন একটি পুরোনো লকনগাছ দেখিয়ে বললেন, এই গাছ থেকে আগে সর্বোচ্চ পাঁচ মণ আম পাওয়া যেত। বাজারে প্রতি মণ লকনা বিক্রি হতো প্রায় চার হাজার টাকায়। এখন সেই গাছেই কাটিমন ধরেছে। বর্তমানে কাটিমন প্রতি মণ সাত থেকে আট হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আশ্বিন-কার্তিকে আম পাকলে মিষ্টতা বাড়বে। তখন প্রতি মণ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
সাহাবুদ্দিনের হিসাব, বর্তমান দামেও একটি বড় গাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকার আম বিক্রি হতে পারে। তবে কাটিমনের পরিচর্যার খরচ লকনার তুলনায় বেশি বলেও জানান তিনি।
বাগানে দেখা গেল, পুরোনো মুকুল ও কিছু নতুন পাতা ভেঙে দিচ্ছেন সাহাবুদ্দিন। তাঁর ব্যাখ্যা, পুরোনো মুকুল ও পাতাগুলো গাছের খাবার নষ্ট করছে। তাই সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে গাছের শক্তি ফলনে কাজে লাগে। ছোট গাছগুলোতে গত বছরই মুকুল এসেছিল। কিন্তু প্রথম বছর আম নিলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ত। তাই সাড়ে তিন বছর পর এই মৌসুমে তাঁরা আম সংগ্রহ করবেন।
কাটিমনের চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমের জাত বদলের কাজও বেড়েছে। পুরোনো আমগাছের জাত বদলে কাটিমনে রূপান্তর করার কাজ করছেন কিছু যুবক।
ওই বাগানে কাজ করছিলেন মো. রনি ও আবির হোসেন। তাঁরা বলেন, একটি গাছের প্রায় আড়াই ইঞ্চি কচি ডগা অন্য গাছে প্রতিস্থাপন করতে হয়। এতে সময় লাগে বড়জোর এক মিনিট। প্রতিটি ডগা প্রতিস্থাপনের জন্য তাঁরা চার থেকে পাঁচ টাকা পারিশ্রমিক নেন।
রনি বলেন, গ্রাফটিংয়ের প্রায় ২০ দিনের মধ্যে বোঝা যায়, টেপ লাগানো (প্রতিস্থাপিত) ডালটি টিকে থাকবে কি না। ডালটি বেঁচে গেলে নতুন পাতা গজায়। তবে টেপের ভেতরে পানি ঢুকলে সমস্যা হয়। এ জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বালাইনাশকও ব্যবহার করতে হয়।
কাটিমন জাতের আমের বৈশিষ্ট্যও চাষিদের আগ্রহের বড় কারণ। গড় ওজন প্রায় ৩৯৬ গ্রাম। আকৃতি লম্বাটে। শাঁস হালকা হলুদ, বুনট দৃঢ় ও কিছুটা রসালো। খাদ্যোপযোগী অংশ প্রায় ৭৮ শতাংশ। খোসা মাঝারি মোটা ও সহজে ছাড়ানো যায়। আঁটি পাতলা।
কাঁচা ও পাকা—দুই অবস্থাতেই খাওয়া যায় এই আম। বছরে তিনবার ফলন দেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫ থেকে ১৮ টন পর্যন্ত হতে পারে। সংরক্ষণক্ষমতাও ভালো বলে কৃষকদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে।
তবে দেশে এখনো কাটিমনকে স্বীকৃত জাত হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। মাঠপর্যায়ে এর চাষ বাড়লেও জাত হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি এখনো আলোচনার বাইরে।
কাটিমনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, কাটিমন থাইল্যান্ডের আম। আট থেকে ১০ বছর আগে আমের এই জাত বাংলাদেশে এসেছে। ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, যত দিন কাটিমনের উৎপাদন বেশি হচ্ছে না, তত দিন এটি চাষিদের জন্য লাভজনক থাকবে।
আমচাষিদের কাছে কাটিমনের আকর্ষণ শুধু বছরে একাধিকবার ফলন নয়, অসময়ে আম পাওয়ার সুযোগও। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আমের ভিড় পেরিয়ে যখন বাজারে দেশি আমের সরবরাহ কমে আসে, তখন কার্তিকের কাটিমন হয়ে উঠতে পারে নতুন বিকল্প।