
মুন্সিগঞ্জে একজন কৃষক এবং বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের ১৩ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার রাত থেকে আজ রোববার ভোর পর্যন্ত থানা-পুলিশ জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তার করতে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গজারিয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমিরুল ইসলাম, লৌহজং উপজেলার খিদিরপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আউটশাহী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিক শিকদার, যশলং ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ তালুকদার। এ ছাড়া মুন্সিগঞ্জ সদর থানা এলাকা থেকে দুজন, শ্রীনগর থানা এলাকা থেকে পাঁচজন, সিরাজদিখান ও গজারিয়া থানা এলাকা থেকে একজন করে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা এলাকার চায়ের দোকানে চা পান করছিলেন কৃষক মোহন মিয়া (৫০)। সেখান থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। আজ রোববার বিস্ফোরক দ্রব্য ও গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। চাচাকে জামিনে বের করতে মুন্সিগঞ্জ আদালতে ছুটে যান মাহফুজা আক্তার।
মাহফুজা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর চাচার বিরুদ্ধে এর আগে কোনো মামলা ছিল না। তিনি রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নন। কৃষিকাজ করে সংসার চালান। যেখান থেকে তাঁকে ধরে আনা হয়, প্রতিদিন তিনি সেখানে বসেই চা খেতেন। নিরপরাধ চাচাকে ছেড়ে দিতে পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু পুলিশ ছাড়েনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহন মিয়ার এক স্বজন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মামাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে রাতেই তাঁরা থানায় যান। সেখানে পুলিশের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর মামাকে ছাড়ানোর বিষয়ে কথা বলেন। পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, ছাড়া যাবে না। তবে ১৫ হাজার টাকা দিলে তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। সেই টাকা না দেওয়ায় তাঁর মামাকে বিস্ফোরক দ্রব্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিকুজ্জামান বলেন, মোহন মিয়ার নামে কোনো মামলা ছিল না। তাঁকে শহরে কলেজ এলাকায় বিস্ফোরণ, গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫৪ ধারায় মামলা দেওয়ার বিষয়ে কথা বলে কেউ টাকা চেয়ে থাকলে, সেটা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর ও নাশকতার অভিযোগে কয়েক দিনে জেলার ছয়টি উপজেলায় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নাটক সাজিয়ে বিএনপির ৫০০-৬০০ নেতা-কর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এর আগেও বিএনপির কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন। ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশে নেতা-কর্মীরা যাতে যেতে না পারেন, সে জন্য এসব মামলায় তাঁদের ধরপাকড় করা হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হচ্ছে। ভয়ে সাধারণ মানুষও আতঙ্কে রয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে দলীয় নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেককে আবার গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন দেব প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা বিশৃঙ্খলা ও নাশকতামূলক কাজ করে বিভিন্ন থানা এলাকার পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছেন, পুলিশ শুধু তাঁদেরই গ্রেপ্তার করছে। এ পর্যন্ত যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিটি থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য ও ভাঙচুরের মামলা রয়েছে। নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলবে। এ অভিযানের সাধারণ মানুষের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক ও তাঁর নাম মামলায় আনা হলে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও পুলিশ যতই মামলা করুক, বিএনপি নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করুক, কোনোভাবেই ঢাকার গণসমাবেশে যাওয়াকে আটকাতে পারবে না। যেভাবে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, এসব নিন্দনীয় কাজ। পুলিশের অভিযান, গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা।