
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা হারুনুর রশিদ খানের (৭০) জানাজায় দাঁড়িয়ে ছেলে আমিনুর রশিদ খান তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চেয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার চক্রধা ইউনিয়নের মজলিশপুর গ্রামে বাড়ির সামনে মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে হারুনুর রশিদ খানকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। জানাজার পর তাঁর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
জানাজায় অংশ নেন জেলা প্রশাসক আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান, পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম, সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন, সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আশরাফ খান, সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জি এম তালেব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা মোহাম্মদ আলী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন ভূঁইয়া প্রমুখ।
জানাজার আগে নিহত হারুনুর রশিদ খানের ছেলে আমিনুর রশিদ খান ও ভাতিজা ফজলে রাব্বি খান কথা বলেন। আমিনুর রশিদ খান বলেন, ‘আজ বাবার জানাজায় জেলার গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা উপস্থিত আছেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে এত দিন তাঁকে শারীরিকভাবে কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি আপনাদের কারও সঙ্গে কোনো অন্যায় করে থাকলে তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার বাবাকে বাড়িতে ঢুকে যারা গুলি করেছে, তাদের সবার বিচার চাই আমি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এই দাবি আমাদের।’ চিকিৎসা চলাকালে পাশে থাকায় শিবপুরের সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, পলাশের সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান ও শিবপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফ উল ইসলাম মৃধার প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।
আমিনুর রশিদ খান আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যাদের নাম এসেছে, বুক ফুলিয়ে তারা থানায় যায়-আসে, অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দেয়। যিনি তাদের মদদ দিচ্ছেন, তাঁরও বিচার চাই আমি। ৫০ বছর ধরে শিবপুরে রাজনীতি করা আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে না, যদি তাঁর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার না হয়।’
জানাজার আগে ফজলে রাব্বি খান বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন তাঁর চাচা হারুনুর রশিদ খান। মে মাসজুড়েই তাঁর অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। তিনি কোনো দিন হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তাই সবার কাছে করজোড়ে অনুরোধ, কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সোয়া ৬টার দিকে শিবপুর পৌর এলাকার বাজার সড়কের বাড়িতে ঢুকে হারুনুর রশিদকে গুলি করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর পিঠ (মেরুদণ্ড-সংলগ্ন) থেকে দুটি গুলি বের করা হয়। শেষ পর্যন্ত গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হারুনুর রশিদ খান। মধ্যরাতে ওই হাসপাতাল থেকে তাঁর লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন স্বজনেরা। আজ শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ বাড়িটির আঙিনায় এসে ভিড় করেন। উপস্থিত হন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ও দলমত-নির্বিশেষে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। নিহত হারুনুর রশিদ খান শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
এ ঘটনায় আমিনুর রশিদ খান বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন শিবপুরের কামারগাঁও এলাকার আরিফ সরকার, ইরান মোল্লা ও হুমায়ুন; পূর্ব সৈয়দনগরের মো. মহসিন মিয়া; মুনসেফেরচরের মো. শাকিল এবং নরসিংদী শহরের ভেলানগরের গাড়িচালক নূর মোহাম্মদ। তাঁদের মধ্যে শাকিল, নূর মোহাম্মদসহ ১১ জন কারাগারে আছেন।
মামলার এজাহার বলা হয়, আসামিরা হারুনুর রশিদ খানের মুঠোফোনে কল করে এলাকার একটি মসজিদের জন্য অনুদান চাইতে আসেন। মহসিন মিয়া, ইরান মোল্লা ও শাকিল নামের তিনজন ঘটনার দিন সকাল সোয়া ছয়টার দিকে পাঁচতলা বাড়িটির তৃতীয় তলায় গিয়ে কলিং বেল চাপলে হারুনুর রশিদ খান নিজেই দরজা খুলে দেন। তাঁদের বসতে বলে আপ্যায়নের জন্য পেয়ারা নিয়ে আসেন তিনি। ঠিক তখনই ওই তিনজন পিস্তল বের করে দুটি গুলি করেন। এতে পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে হারুনুর রশিদ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাঁরা সিঁড়ি বেয়ে নেমে মোটরসাইকেলে করে থানা-সংলগ্ন সড়ক ধরে পালিয়ে যান।
শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ তালুকদার বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানকে গুলির ঘটনায় করা মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ মামলার এজাহারভুক্ত ২ জনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ পলাতক চারজন দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জেনেছেন। তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।