সোনালুর হলুদ রঙে সেজেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ। বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায়
সোনালুর হলুদ রঙে সেজেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ। বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায়

পিচঢালা মহাসড়কে সোনালু ফুলের হলুদ ‘অভ্যর্থনা’

কাঠফাটা রোদ্দুর আর তপ্ত বাতাসে বৈশাখ যেমন রুদ্রমূর্তি দেখাচ্ছে, তেমনি পুষ্প-পল্লবে প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলেছে অনন্য সাজে। গ্রামবাংলার আনাচকানাচে এখন রংবেরঙের ফুলের মেলা। নাগরিক কোলাহল ও যান্ত্রিকতার মধ্যে কিছু ফুল এমনভাবে নিজেকে মেলে ধরেছে, যেন তপ্ত দুপুরে পথচারীদের এক পশলা প্রশান্তি দিচ্ছে। তেমনই এক নজরকাড়া ফুল সোনালু। তার সোনালি আভা প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তুলেছে ঐশ্বরিক নান্দনিকতায়।

গ্রামবাংলার শান্ত জনপদ ছাপিয়ে দেশের ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এখন সোনালুর ছড়াছড়ি। পিচঢালা রাস্তার সমান্তরালে যেন বয়ে চলেছে হলুদের অবিরাম এক স্রোত। মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের বিভাজকগুলোতে ফুটে থাকা শত শত সোনালু ফুল দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন পরম মমতায় হলুদ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে, যা মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের ‘হলুদ অভ্যর্থনা’ জানাচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা পড়েছে কুমিল্লায়। সরেজমিনে কুমিল্লার কোটবাড়ী নন্দনপুর থেকে আলেখারচর চক্ষু হাসপাতাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় সোনালুর রাজত্ব দেখা যায়। গাছের ডাল ছাপিয়ে ঝুমকোর মতো ঝুলে থাকা ফুলগুলো যেন বাতাসের দোলায় গ্রীষ্মের জয়গান শোনাচ্ছে। কোনো কোনো গাছের ফুলের থোকা এমনভাবে নিচে নেমে এসেছে, যা দেখে যে কারও মন ভালো হয়ে যাবে।

চৌদ্দগ্রামের মিয়ার বাজার, দাউদকান্দি, চান্দিনা ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিভিন্ন অংশেও সোনালুর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে মিয়ার বাজার এলাকায় সোনালু ফুল আরও ঘন ও উজ্জ্বল। রোদঝলমল দুপুরে কিংবা বিকেলের কোমল আলোয় ফুলগুলো এমনভাবে দীপ্তি ছড়ায় যে চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়েও চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের সড়ক বিভাগে লাগানো সোনালুগাছে ফুল ফুটেছে। বৃহস্পতিবার কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায়

মহাসড়কের পাশে সোনালুর রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে অনেককে গাড়ি থামিয়ে মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দী করতে দেখা যায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ব্যস্ত মহাসড়কে ধুলোবালি ও ধোঁয়ার মধ্যে সোনালু ফুলগুলো যেন চোখের প্রশান্তি। তাঁর বাসা কোটবাড়ী। কলেজে যাওয়ার সময় প্রায়ই এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফুলগুলোকে মন ভরে দেখেন। তীব্র রোদের মধ্যেও হলুদ ফুলগুলো মনে শীতল একটা অনুভূতি এনে দেয়।

বাসচালক মাসুদ আলমের কণ্ঠেও ঝরল সোনালুর সৌন্দর্যের মুগ্ধতা। মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা দিন স্টিয়ারিং ধরে রোদের মধ্যে গাড়ি চালাই। কিন্তু মহাসড়কের মাঝখানে যখন এই সারি সারি হলুদ ফুলসহ নানা রঙের ফুল দেখি, তখন মনটা ভালো হয়ে যায়। তখন মনে অন্য ধরনের শান্তি লাগে।’

কুমিল্লা থেকে ঢাকাগামী বাসের যাত্রী আশিকুর রহমান বলেন, মহাসড়কে এমন রঙিন দৃশ্য থাকলে মনটা ভালো হয়ে যায়। একঘেয়ে যাত্রাও তখন আর বিরক্তিকর লাগে না। বিভাজকে গাছ শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, মানসিক প্রশান্তির জন্যও জরুরি।

মোটরসাইকেলচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, গ্রীষ্মের এই সময়টাতে চলাচলের সময় প্রতিদিনই তিনি কাউকে না কাউকে সোনালুর ছবি তুলতে দেখেন। ফুলের সৌন্দর্যে মানুষ থেমে যাচ্ছে, ছবি তুলছে—এটা খুব সুন্দর একটা বিষয়।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, সোনালুর ইংরেজি নাম ‘Golden shower tree’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ‘Cassia Fistula’। কুমিল্লা অঞ্চলে এটি সোনালু হিসেবে পরিচিত হলেও স্থানীয়ভাবে কোথাও একে ‘হনালু’, এটির ফলকে ‘বাঁদরলাঠি’ নামেও ডাকা হয়। শুধু সৌন্দর্য নয়, বৃক্ষটি ঔষধি গুণেও ভরপুর। বাত, বমি ও রক্তস্রাব প্রতিরোধে সোনালুর ফল অত্যন্ত কার্যকর। সোনালু মূলত গ্রীষ্মের উদ্ভিদ। বসন্তে পাতা ঝরিয়ে রিক্ত হওয়ার পর বৈশাখে নতুন পাতার সঙ্গে উজ্জ্বল হলুদ ফুল ফোটে।

ফুটে আছে দৃষ্টিনন্দন কলাবতী ফুল। বৃহস্পতিবার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর এলাকায়

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সোনালু বাংলাদেশের স্থায়ী এক বৃক্ষ। তবে আদি বাস পূর্ব এশিয়ায়। ফুলগুলো পত্রশূন্য ডালে যেভাবে ঝুলে থাকে, তা পৃথিবীর খুব কম ফুলেই দেখা যায়। মাঝারি আকৃতির বৃক্ষটির উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ ফুট হয়। ফুলে পাপড়ি পাঁচটি। এটির ১০টি পুংকেশর ও দীর্ঘ মঞ্জুরি দণ্ড আছে। বসন্তে পত্রশূন্য থাকে। বৈশাখে নতুন পাতা গজায়। প্রকৃতিতে শোভাবর্ধনে সোনালুর জুড়ি নেই। একসময় গ্রামে প্রচুর দেখা গেলেও এখন কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে শহর ও সড়কের পাশে আবার লাগানো হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, মহাসড়কের বিভাজকে এই বৃক্ষরোপণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সৌন্দর্যবর্ধন এবং রাতের বেলা বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির হেডলাইটের আলো সরাসরি চালকের চোখে পড়া রোধ করা। হলুদ সোনালু এখন মহাসড়কের বুকে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। তাঁদের কর্মীরা নিয়মিত গাছগুলোর পরিচর্যা করেন।