কলেজের কয়েকটি কক্ষে এলোমেলো পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চ। তাতে পড়েছে ধুলার আস্তরণ। ৭ জুলাই মাগুরার শালিখা উপজেলার চুকিনগর এলাকায়
কলেজের কয়েকটি কক্ষে এলোমেলো পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চ। তাতে পড়েছে ধুলার আস্তরণ। ৭ জুলাই মাগুরার শালিখা উপজেলার চুকিনগর এলাকায়

মাগুরার এই কলেজে পাঠদানের চিহ্ন নেই, তবু দেড় কোটির ভবন বরাদ্দ

পাশাপাশি দুটি জরাজীর্ণ আধা পাকা ঘর। কোনো পাশে ইটের দেয়াল, আবার কোনো পাশে টিনের বেড়া। চারপাশ ঝোপঝাড় ও ময়লায় ভর্তি। নামফলক না থাকায় দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কী। কাছে গিয়ে দেখা গেল, বারান্দায় জন্মেছে ঘাস–লতা। বেশির ভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বসার বেঞ্চ দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল এটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে জমে থাকা ধুলো আর চারপাশের পরিবেশ বলে দিচ্ছে—দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো পাঠদান হয়নি।

এই চিত্র মাগুরার শালিখা উপজেলার মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের। এর অবস্থান উপজেলার আড়পাড়া-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে চুকিনগর এলাকায়। কারিগরি প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েছে।

মাগুরা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের আওতায় জেলার দুটি সংসদীয় আসনে তিনটি করে মোট ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণে দেড় কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শালিখা উপজেলার মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজ এর মধ্যে একটি। এই চিঠিতে দরপত্র আহ্বানের লক্ষ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সরেজমিনে জরিপ প্রতিবেদন ও ১৫ আগস্টের মধ্যে মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পদাধিকারবলে মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। মাসখানেক আগে শালিখার ইউএনও হিসেবে যোগ দেওয়া তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠানে সরকারি বরাদ্দে মাটি ফেলার কাজ তদারকি করতে গিয়েছিলাম। তবে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করা হয়নি। তাই একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়নি। তবে শুনেছি, প্রতিষ্ঠানটি চালু আছে।’

৭ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে চুকিনগর এলাকায় দেখা গেছে, কলেজের কোনো নামফলক নেই। কলেজের নামে থাকা পুরোনো দুটি ঘর অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সামনে বৃষ্টির পানি জমে সামনে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পুরো প্রতিষ্ঠানে কোনো লোকজনের উপস্থিতি নেই। দুটি ভবনের কিছু কক্ষের দরজা তালাবদ্ধ, সেগুলোতে মরিচা পড়েছে। আর কিছু কক্ষ খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু কক্ষের বেড়া ভেঙে জরাজীর্ণ অবস্থা, যে কেউ বিনা বাধায় ভেতরে ঢুকতে বা বেরোতে পারে।

কলেজ চত্বরে বড় বড় ঘাস আর জরাজীর্ণ ভবন দেখে মনে হয়, সেখানে নিয়মিত মানুষের পা পড়ে না। ৭ জুলাই মাগুরার শালিখা উপজেলার চুকিনগর এলাকায়

২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। প্রথম কয়েক বছর শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকলেও গত প্রায় সাত বছর এখানে নিয়মিত কোনো শিক্ষা কার্যক্রম চলতে দেখেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুকিনগর গ্রামের এক বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই কলেজের যারা উদ্যোক্তা, তাঁরা বিএনপির রাজনীতি করত। সে কারণে কলেজ চালুর কয়েক বছরের মাথায় আর চালাতে পারেনি।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি যে ব্যক্তির নামে, তিনি ছিলেন আড়পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁর সন্তানদের উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। তাঁর বড় ছেলে মনিরুজ্জামান (চকলেট) উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে জেলা বিএনপির সদস্য। কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন মুন্সী শহিদুর রহমানের আরেক ছেলে মো. কামরুজ্জামান নবাব।

বর্তমানে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি রয়েছে (প্রথমে অবশ্য ২৫-৩০ জনের কথা বলেন) বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান। এর মধ্যে চলতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৫ জনের মতো। এখন পরীক্ষা চলমান থাকায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে দাবি করে অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘এখানে যারা শিক্ষার্থী তারা বেশির ভাগই চাকরিজীবী, এ কারণে নিয়মিত আসে না। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছরই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। গত মাসেও ক্লাস হইছে ওখানে।’ এই অধ্যক্ষ জানান, তিনিসহ প্রতিষ্ঠানে ১৪ জন শিক্ষক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সব শিক্ষকই খণ্ডকালীন হিসেবে চাকরি করছেন।

ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার বিষয়ে অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘গত ১৭ বছর ৮-১০টি মামলার শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। এখানে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, তাদের নামেও মামলা দেওয়া হয়েছে। একবার ঝড়ে টিনের চালা উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সাহায্যের জন্য ইউএনও অফিসে গেলে কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দিত। নতুন ভবন হলে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াবে।’

কলেজের নামে থাকা পুরোনো দুটি ঘর অনেকটাই পরিত্যক্ত। সামনে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ৭ জুলাই মাগুরার শালিখা উপজেলার চুকিনগর এলাকায়

কলেজের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে শালিখা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে সেখানে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। মাগুরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাহীলুদ্দীন বলেন, ‘বিএম কলেজগুলো কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এগুলোর নামের তালিকা ছাড়া কোনো তথ্য শিক্ষা অফিসে নেই।’

পরে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের পরিচালক মো. হুসাইন শওকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে জানান, এ বিষয়ে তথ্য জানতে হলে তথ্য অধিকার আইনে তাঁর কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে।

জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোন প্রতিষ্ঠানে ভবন হবে তার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যরা আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। এর ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় এসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ দেয়।

এ বিষয়ে মাগুরা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধান কার্যালয় সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দরপত্র কার্যক্রমে যাওয়া হবে কি না। বর্তমান জরিপ ফরমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম–সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হয়নি। তবে একটি মন্তব্য কলাম রয়েছে। জরিপ চলাকালে কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যত্যয় বা অন্য কোনো অসংগতি চোখে পড়লে তা ওই মন্তব্য কলামে উল্লেখ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও শিক্ষার মান মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন মাগুরার একটি বেসরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পাঠদান বা পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আগে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক সক্ষমতা যাচাই করে তারপর উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া উচিত।