সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে টসটসে লাল রাম্বুটান। পাশের সারিতেই লিচুর মতো দেখতে সুস্বাদু লংগান। কোথাও থাই কাটি আম, কোথাও আবার পেঁপে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের গোয়ারী গ্রামের প্রায় ২০ বিঘার বাগানজুড়ে এখন বিদেশি ফলের সমারোহ। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন ফল দেখতে ও কিনতে। আবার অনেকে আসছেন এমন বাগান গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।
ভালুকা-গফরগাঁও সড়ক থেকে ইটের সলিং করা পথ ধরে কিছুদূর এগোলেই ‘তাইফ অ্যাগ্রো’র এই বাগান। ঢাকার বাড্ডার বাসিন্দা দুই তরুণ উদ্যোক্তা শেখ মামুন ও আশরাফ শুভ ১০ বছরের জন্য জমি ইজারা নিয়ে গড়ে তুলেছেন এ বাগান। একই এলাকার হওয়ায় দুজনেই বাগান করার ইচ্ছা থেকে এক বন্ধুর মাধ্যমে ভালুকায় জমি ইজারা নিয়ে গড়েন স্বপ্নের বাগান। এতে তাঁদের বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে এ সফলতার গল্প শুরু হয়েছিল লোকসান দিয়ে।
দেশি ফল থেকে বিদেশি ফল
২০১৯ সালে আম, পেয়ারা, কুল, বরইসহ দেশি ফল দিয়ে বাগান শুরু করেছিলেন দুই উদ্যোক্তা। এক বছরের মধ্যেই ফল আসে। কিন্তু উৎপাদিত ফল বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে দাম শুনে হতাশা শুরু হয়েছিল জানান উদ্যোক্তা শেখ মামুন। তিনি বলেন, দেশি ফল বিক্রি করে উৎপাদন খরচ, এমনকি শ্রমিকের মজুরিও উঠছিল না। বরই ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি, পেয়ারা ১০ থেকে ১৫ টাকা কেজি বিক্রি হতো। ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছিল আম। হিসাব করে দেখেন, এভাবে এগোনো সম্ভব নয়।
দেশি ফল চাষে লাভের আশা কম দেখে হতাশ হন দুই উদ্যোক্তা। তখন তাঁরা দেশে চাহিদা আছে, কিন্তু উৎপাদন হয় না এমন ফল খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে বিদেশি ফল চাষের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থাইল্যান্ড থেকে রাম্বুটান ও লংগানের চারা এনে ২০২০ সালের শেষ দিকে বাগানে রোপণ করা হয়। দুই বছরের মধ্যেই ফল আসতে শুরু করে।
শেখ মামুন বলেন, থাইল্যান্ড থেকে ৪০০ চারা আমদানি করা হলেও শুরুতে না বুঝে রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে ১৮৮টি গাছ মরে যায়। বর্তমানে ২১২টি রাম্বুটানগাছ আছে। ২০২৩ সালে প্রথম ফল আসতে শুরু করে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করায় ফলন হয়েছে কয়েক গুণ বেশি।
বাগান থেকেই ফল বিক্রি
সম্প্রতি (গত ১৭ জুলাই) বাগান ঘুরে দেখা গেছে, লাল টসটসে রাম্বুটান ঝুলছে গাছে গাছে। যেন চোখ জুড়ায়। শুধু লাল রঙের নয়, হলুদ রঙের রাম্বুটানও রয়েছে বাগানে।
গত বছর বাগান থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকার রাম্বুটান ফল বিক্রি হয়েছে জানান শেখ মামুন। তিনি বলেন, এ বছর দ্বিগুণ ফলনের আশা করলেও বৃষ্টি আগে চলে আসায় পাতা এসেছে বেশি। তাই ফল আশানুরূপ না হলেও চলতি বছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন।
বর্তমানে রাম্বুটান প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ মামুন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে বাজার খুঁজতে হয় না। পাইকারেরা নিজেরাই বাগানে চলে আসেন। খুচরা ক্রেতারাও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফল কিনতে আসেন।’
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, রাম্বুটান ফলটি লিচু পরিবারের। চীন, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয়। ফলটির খোসা হালকা চুলের মতো আবরণে ঢাকা। মালয় ভাষায় ‘রাম্বুট’ শব্দের অর্থ চুল। তাই অনেকে একে হেয়ারি লিচু, কেউ কেউ ফলের রানিও বলেন। এর আকার মাঝারি ধরনের এবং পাকলে বর্ণ লাল। এটি মিষ্টি স্বাদযুক্ত একটি ফল। বাংলাদেশে সাধারণত বছরে দুবার—জুন-জুলাই এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে রাম্বুটান পাওয়া যায়। এপ্রিলে গাছে ফুল আসে এবং গ্রীষ্মের শেষে বা শরতে ফলগুলো পরিপক্ব হয়ে খাওয়ার উপযোগী হয়।
বাগান থেকে এখনো পুরো বিনিয়োগ উঠে আসেনি উল্লেখ করে শেখ মামুন বলেন, ‘বাজারের চাহিদা, ফলের মান এবং ক্রেতাদের আগ্রহ দেখে আমরা আশাবাদী। ভবিষ্যতে বিদেশি ফলের আবাদ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
নানা জাতের লংগানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
রাম্বুটানের পাশাপাশি বাগানটিতে নানা জাতের লংগানও ফলেছে। এবার বাম্পার ফলন হয়েছে রসালো ও সুমিষ্ট লংগান। উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ বলেন, তাঁদের বাগানে ফোর সিজন, কোহেলা, রুবি, হোয়াইট, পিংপং, ডায়মন্ড রিভারসহ বিভিন্ন জাতের লংগান রয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে ৫০টি চারা সংগ্রহ করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কোন জাত ভালো হয়, কোনটির ফলন বেশি এবং স্বাদ ভালো—তা পরীক্ষা করা। এখন সব জাতেই ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন সুপারশপ ও ফলের আড়তের ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই ফল সংগ্রহ করেছেন। প্রতি কেজি লংগান ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় লাখ টাকার মতো লংগান বিক্রি করেছেন বলে জানান উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ।
কৃষি বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, লিচুর বিকল্প হিসেবে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পুষ্টিকর ক্রান্তীয় ফল ‘লংগান, যা স্থানীয়ভাবে ‘কাঠলিচু’ নামে পরিচিত। লিচু মৌসুমের ঠিক পরপরই বাজারে আসার উপযোগী হয়। এই ফল দেখতে গোল, খোসা হালকা বাদামি এবং ভেতরের শাঁসটি লিচুর মতোই নরম, রসালো ও সুমিষ্ট। ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই ফল দেশের আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
বাগানে আগ্রহী মানুষের ভিড়
বিদেশি ফল হওয়ায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসছেন। অনেক কৃষক এখন এসব ফলের বাগান গড়তে আগ্রহী হচ্ছেন।
গাজীপুরের বোর্ডবাজার থেকে পোশাকশ্রমিক সুমন চন্দ্র রায় রাম্বুটান বাগান দেখতে আসেন। বাগানে এসে ফলের সঙ্গে তোলেন সেলফিও। তিনি বলেন, ‘ইউটিউবে বাগানটির ভিডিও দেখে এখানে এসেছি। ভাবতেই পারিনি বাংলাদেশের মাটিতে এত সুন্দর রাম্বুটান হয়। ফল দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিছু ফল কিনব, ভবিষ্যতে নিজেরও এমন একটি বাগান করার ইচ্ছা আছে।’
মুক্তাগাছা থেকে আসা মো. রাজিবও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি আগ্রহ। ইউটিউবে দেখে এসেছি। আসলে এই ফলে দেশে হবে কী হবে না—এ চিন্তা করে দেখতে এসেছি। বাগান দেখে মন ভরে গেছে। চারা কিনে নিয়ে গিয়ে নিজের জমিতেও লাগাব।’
গাজীপুর থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী শরিফুল ইসলামের সঙ্গেও বাগানে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘এত দিন শুধু অনলাইনেই দেখেছি। বাস্তবে কখনো রাম্বুটান খাওয়া বা দেখার সুযোগ হয়নি। মনের ভেতর সুপ্ত একটা ইচ্ছা ছিল—সুযোগ পেলে রাম্বুটানের চারা সংগ্রহ করে নিজের বাড়িতে রোপণ করব। আজ সময় সুযোগ করে এখানে চলে এলাম। ফলটি স্বচক্ষে দেখার অনুভূতিটাই আলাদা।’
ভালুকা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূর জাহান বলেন, রাম্বুটান ও লংগান—দুটো ফলেরই দেশের বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। রাম্বুটান উচ্চ মূল্যের এবং অত্যন্ত সুস্বাদু ফল। এতে ভিটামিন সি ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রয়েছে। গাছের পরিচর্যা তুলনামূলক কম লাগে, রোগবালাইও কম। সঠিক উদ্যোগ নিলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানিও সম্ভব।