ভাসানচর সন্দ্বীপের নাকি হাতিয়ার—অবশেষে এই বিতর্কের অবসান হলো। ভাসানচরের ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর আগে সীমানা নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন চলছিল চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর হাতিয়াবাসীর মধ্যে। ২০১৭ সালে দ্বীপটিকে হাতিয়ার অন্তর্গত দেখিয়ে সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনের পর সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে। অবশেষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটি ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে প্রতিবেদন দেয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা সেই মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করে ১৩ জানুয়ারি সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি প্রেরণ করে।
সরেজমিন পরিদর্শন, ঐতিহাসিক দলিলের মূল্যায়ন ও স্যাটেলাইট ইমেজ (ভূ-উপগ্রহের ধারণকৃত ছবি) বিশ্লেষণ করে দ্বীপটির ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে প্রতিবেদন দিয়েছে সীমানা বিরোধ নিরসনে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত একটি কারিগরি কমিটি।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন ১৯৯২ সালের দিকে সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন সাগরগর্ভে বিলীন হয়। ভাঙনের পরপরই পুনরায় সেখানে চর জাগতে শুরু করে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি গত শতকের নব্বইয়ের দশকে নতুন ভূমি জেগে উঠতে শুরু করে বলে বন বিভাগের তথ্য সূত্রেও জানা গেছে। এরপর কয়েক দশক দ্বীপের ভূমির পরিমাণ বাড়তে থাকে। স্থানীয়ভাবে ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে পরিচিতি পেলেও ২০১৭ সালের দিকে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের আলোচনার মধ্যেই সেটির নামকরণ হয় ভাসানচর। একই বছর দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে সেটিকে নোয়াখালীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ সেখানে ‘ভাসানচর থানা’ গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেই প্রজ্ঞাপনেও ভাসানচরকে হাতিয়া ও নোয়াখালীর অংশ বলে উল্লেখ করা হলে সন্দ্বীপের ছাত্র, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ তখন বিক্ষোভ করেন।
সম্প্রতি সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্তরের মানুষের দাবির মুখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সীমানা জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে। ‘চট্টগ্রাম-নোয়াখালী জেলার সীমানা জটিলতা নিরসন কমিটি’ নামের এই কমিটিতে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার নির্বাহী কর্মকর্তার পাশাপাশি পেশাজীবীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভায় সিদ্ধান্তের আলোকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা ভাসানচরকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত দেখিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ভাসানচরের সীমানা বিরোধ নিরসনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই এ নিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মানুষজন নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। গত ৭ এপ্রিল এ নিয়ে এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ ফেসবুকে ভাসানচরকে হাতিয়ার দাবি করে একটি পোস্ট দেন। একই সময়ে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ তুলে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে হাতিয়া দ্বীপ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন করা হয়। একই দিন চট্টগ্রামেও হাতিয়াবাসীর পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়।
ন্যায়ামস্তি নামের সন্দ্বীপের একটি ইউনিয়ন পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়ে যায় ১৯৯২ সালে। এরপর ওই স্থানেই নতুন ভূমি জেগে ওঠে। সন্দ্বীপ থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে জেগে ওঠা নতুন দ্বীপটিই ভাসানচর। সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের দাবি, এটি ভাঙনে বিলীন হওয়া ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের জায়গায় গড়ে উঠেছে। সে কারণে দ্বীপটি সন্দ্বীপের।
সন্দ্বীপের প্রায় সব ইউনিয়নের বাসিন্দাদের আদি ভিটা ছিল ন্যায়ামস্তিতে। ফলে ভাসানচর নোয়াখালীর সঙ্গে যুক্ত করার সরকারি ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন সন্দ্বীপের মানুষ। সে সময় মনিরুল হুদা নামের সন্দ্বীপের এক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত নির্বাহী বিভাগের প্রতি জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটিও প্রতিপালিত হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী বিভাগ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে।
কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জেলা প্রশাসকসহ সন্দ্বীপ ও হাতিয়া উপজেলা থেকে তিনজন করে পেশাজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গত ৯ মার্চ এই কমিটির প্রথম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিএস ও আরএস জরিপ এবং স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনা করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ ভাসানচরকে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার ভূমি বলে প্রতিবেদন জমা দিলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য আরও সময় নেওয়া হয়েছিল।
ডিপটি সওদাগরের বাড়ি ছিল ন্যামস্তির ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। এখন তিনি সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের কাছে। যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সাবেক বাড়ির এলাকাটি চিহ্নিত করতে পারেন। যেটি এখন ভাসানচরের মধ্যভাগে অবস্থিত। তাঁর দাবি, জেগে ওঠা ভূমি কোনো আলাদা মৌজার নয়, বরং ভাসানচরের আরও বাইরে পর্যন্ত সন্দ্বীপের ভূমি। প্রথম আলোকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সালে আমরা সারিকাইতে চলে আসি। এটা বেশি দিন আগের কথা নয়। কিসের ভিত্তিতে ভাসানচরকে নোয়াখালীতে নিয়ে যুক্ত করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না। শেষ পর্যন্ত ভাসানচরের মালিকানা ফেরত পাওয়ায় আমরা ভীষণ খুশি।’
সন্দ্বীপের নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাসানচর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপবাসী নাখোশ ছিলেন। এখন এমন সিদ্ধান্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দ্বীপের মানুষ আনন্দিত।’