গজারি বনে গাছ থেকে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার দুপুরে গাজীপুরের শ্রীপুরের বদনীভাঙ্গা এলাকায়
গজারি বনে গাছ থেকে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার দুপুরে গাজীপুরের শ্রীপুরের বদনীভাঙ্গা এলাকায়

গজারি বন থেকে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করেন স্বপন, মাসে আয় ৩০ হাজার টাকা

বাঁশের মাথায় বিশেষ থলে বেঁধে প্রতিদিন ভোরে গজারি বনে ঢুকে পড়েন স্বপন চন্দ্র বর্মণ (৪০)। দৃষ্টি থাকে গাছের মগডালে। যেখানে কয়েকটি পাতা একসঙ্গে জড়ো হয়ে আছে, সেখানেই তাঁর নজর আটকে যায়। ওই পাতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে তাঁর রোজগারের উৎস পিঁপড়ার বাসা।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার শিরিশগুড়ি গ্রামের বাসিন্দা স্বপন চন্দ্র বর্মণ আট বছর ধরে এভাবেই পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করে সংসার চালাচ্ছেন। মা–বাবা, স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে স্বপনের পাঁচজনের সংসার। সংসারের পুরো ভার তাঁর ওপর। পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করেই সংসার চালান তিনি।

স্থানীয়ভাবে এটি ‘মাইজলের ডিম’ নামে পরিচিত। শৌখিন মাছশিকারিদের কাছে এই ডিমের অনেক চাহিদা। বাজারে এর দাম ঋতুভেদে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। তিনি জানান, পরিশ্রম করতে পারলে এই ডিম বিক্রি করে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

স্বপনের পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহের পদ্ধতি বিচিত্র। লম্বা ও ওজনে হালকা বাঁশের ডগায় তিনি বিশেষভাবে তৈরি একটি কাপড়ের থলে বেঁধে নেন। থলের ওপরের অংশে থাকে ছোট ছিদ্রযুক্ত জাল, যাতে শুধু ডিম ঢোকে। গাছের শুকনা পাতা বা পিঁপড়া ঢোকে না। বনে ঘুরতে ঘুরতে গাছের মগডালে জড়ো হয়ে থাকা পাতার নিচে তিনি ওই থলেটি নিয়ে যান। তারপর বাঁশ দিয়ে পাতার গোছায় একনাগাড়ে ধাক্কা দিতে থাকেন। ঝাঁকুনিতে পিঁপড়ার বাসা থেকে ডিমগুলো সরাসরি থলেতে এসে পড়ে।

গতকাল বুধবার দুপুরে শ্রীপুরের মাওনা–কালিয়াকৈর সড়কের বদনীভাঙ্গা গ্রামে বন থেকে ডিম সংগ্রহ করছিলেন স্বপন। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। স্বপন জানান, প্রতি সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন তিনি বনে যান। দিনে ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করতে পারেন। তাঁর বাড়ির চারপাশ ও আশপাশের কয়েক গ্রমের বিস্তৃত গজারি বনে ঘুরে ঘুরে তিনি পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করেন। বছরের বেশির ভাগ সময় প্রতি কেজি ডিম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে জুন, জুলাই ও আগস্টে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম তখন দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। এই তিন মাসেই মূলত তাঁর বড় আয় হয়।

পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করে বিক্রি করেন স্বপন চন্দ্র বর্মণ। গতকাল দুপুরে শ্রীপুরের বদনীভাঙ্গা এলাকায়

ডিম দেখতে চাইলে স্বপন তাঁর বাঁশের ওপর বাঁধা থলেটি মাটিতে নামিয়ে আনেন। থলের ওপর ও আশপাশে তখনো অনেক পিঁপড়া। এগুলো দেখতে কিছুটা হলদে ও লম্বাটে, খুব দ্রুত ছোটে। এদের ডিম ছোট ও সাদাটে। মাছ ধরার টোপ হিসেবে এই ডিমের জুড়ি নেই বলে মনে করেন মাছশিকারিরা।

শ্রীপুরের পিয়ার আলী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধান আহাম্মাদুল কবীর বলেন, ‘ভাওয়াল বনাঞ্চলে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ একটি ঐতিহ্য। আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। গজারিপাতাগুলো দৃষ্টিনন্দনভাবে একসঙ্গে জড়ো করে পিঁপড়ারা বাসা তৈরি করে। সেই বাসা থেকে ডিম সংগ্রহ করা হয়। এগুলো সংগ্রহ ও বিক্রি করে অনেক পরিবার চলে।’

এ পেশায় শুধু স্বপন নন, ওই গ্রামের আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আছেন। বনের ভেতর ঘুরে ঘুরে মাইজলের ডিম কুড়ানোর এই পেশা অনেকের কাছে অচেনা হলেও গজারি বনঘেরা এই এলাকায় এটি এখন অনেকের জীবিকা। শ্রীপুর তথা গাজীপুরের বনের আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য এটি অন্য রকম জীবনসংগ্রামের গল্প।