
বাবার কাছে অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোনের দাবি ছিল স্বাধীন হোসেনের (১৪)। তবে সামর্থ্য না থাকায় কিনে দিতে পারেননি দিনমজুর বাবা দেলবর আলী। মুঠোফোন না পেয়ে অভিমানে বাড়ি ছাড়ে স্বাধীন। দীর্ঘ এক মাস পর তাকে উদ্ধার করা হয়েছে ঢাকার সাভার থেকে।
আজ বুধবার সকালে স্বাধীন হোসেনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বড় বিহানালী ইউনিয়নের বেড়াবাড়ি গ্রামে নিজ বাড়িতে। সে উপজেলার বড় বিহানালী উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।
বাবা দেলবর আলী বলেন, ‘আমি দিনমজুর মানুষ, কষ্ট কইর্যা চলি। বেটা দামি মোবাইল ফোন কিনে চায়ছিল। ট্যাকার অভাবে কিনা দিবার পারিনি, তাই বাড়িত থাইক্যা চইল্যা গেছিল।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১৩ জুন অভিমানে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় স্বাধীন হোসেন। পরিবারের লোকজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও হদিস করতে পারছিল না কিশোর স্বাধীনের। পরে বাগমারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর স্বাধীন একটি মুঠোফোন নম্বর থেকে বাড়িতে কথা বলেছিল। সেই সূত্র ধরে পুলিশের সহযোগিতায় অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাভারের বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্ট থেকে আজ ভোরে স্বাধীনকে উদ্ধার করেন।
চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বাগমারা থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর পুলিশ ওই মোবাইল নম্বর ট্র্যাকিং করে স্বাধীনের অবস্থান আমাদের জানায়। আজ ভোরে সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করি। রেস্টুরেন্টের মালিক ছাড়তে চাইছিলেন না, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে আমাদের কাছে দেওয়া হয়েছে।’ মুঠোফোনের নম্বর ট্র্যাকিং করে অবস্থান নিশ্চিতের কথা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন বাগমারা থানার ওসি জিল্লুর রহমান।
আজ সকালে বেড়াবাড়ি গ্রামে স্বাধীনের বাড়িতে গিয়ে লোকজনের ভিড় দেখা যায়। এক মাস পর ছেলেকে ফিরে পাওয়ায় বাড়িতে আনন্দের সীমা নেই। স্বাধীন জানায়, সাভারের ওই রেস্তোরাঁয় মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে চাকরি নেয় সে। জমানো টাকা দিয়ে অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন কেনার আগ্রহ ছিল। মুঠোফোন কিনে সে বাড়ি ফিরত বলে জানিয়েছে।
মা সুফিয়া বেগম বলেন, ‘বেটাক ফিরে পাব ভাবতে পারিনি। এক মাস পেট ভরে খেতে পারিনি, আজ বেটাক লিইয়্যা একসাথে খাব।’
বর্তমানে শিশুদের অল্প বয়সে স্মার্টফোনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ধনী-গরিব সব পরিবারের শিশুই এর প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। স্মার্টফোন সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় শিশুরা খুব অল্প বয়সেই বিশ্বের নানা ধরনের তথ্যের পাশাপাশি অনুপযুক্ত বিষয়বস্তুরও সংস্পর্শে আসছে। এতে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন নিজে খারাপ নয়; বরং এর সঠিক ব্যবহার শেখানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন মুর্শিদা ফেরদৌস। তবে শিশুদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার সীমিত করা প্রয়োজন। ফোন না পেয়ে আত্মহত্যা বা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্মার্টফোনের অপব্যবহারের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও কলে অন্যকে দেখে আত্মহত্যার মতো আচরণ অনুকরণ করা। এ ধরনের ঘটনা একধরনের সংক্রামক আচরণের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শিশু-কিশোরদের জীবনের মূল্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই সচেতন করে তুলতে হবে।