পাবনার বেড়া উপজেলার মালদাপাড়া গ্রামের তাঁতি একরাম হোসেনের দুটি তাঁত। মাস ছয়েক আগেও তিনি কোনোরকমে তাঁত দুটি চালু রেখে লুঙ্গি উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করতেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর তাঁত দুটি চলছিল ধুঁকে ধুঁকে। শেষ পর্যন্ত মাস ছয়েক আগে তিনি বাধ্য হন তাঁর তাঁত দুটি বন্ধ করে পেশা পরিবর্তন করতে। এখন তিনি ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
একরাম হোসেন বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশা হিসেবে প্রায় ২০ বছর ধইর্যা তাঁত চালাইছি। কিন্তু এই তাঁত আমার সংসারে কোনো সুখ দেয় নাই। শুধু অভাব দিছে। এখন ভ্যান চালায়া আমি আগের চাইতে ভালো আছি।’
একরাম হোসেনের মতো একই অবস্থা বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার অসংখ্য তাঁতির। দীর্ঘদিন ধরে তাঁতশিল্পের দুরবস্থার কারণে এই দুই উপজেলার প্রায় ৭৫ শতাংশ তাঁতই বন্ধ হয়ে গেছে। এসব তাঁতির কেউ রিকশা বা ভ্যান চালান, কেউ দিনমজুরের কাজ করেন, আবার কেউ বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা।
মৌসুমেও সুনসান তাঁতপল্লি
ঈদুল ফিতরের আগে সাধারণত তাঁতিদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় থাকে। বাড়তি চাহিদা আর দামের কারণে এ সময় দিন-রাত তাঁত চালিয়ে উৎপাদন বাড়ান তাঁতিরা। কিন্তু এবার বেড়া ও সাঁথিয়ার তাঁতপল্লিগুলোতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
সরেজমিনে বেড়ার হাতিগাড়া, জগন্নাথপুর, পেঁচাকোলা, রাকশা এবং সাঁথিয়ার ছেঁচানিয়া, করমজা ও সোনাতলা গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, যেখানে একসময় তাঁতের খটর-খট শব্দে মুখর থাকত এলাকা, সেখানে এখন নীরবতা। অধিকাংশ তাঁতঘর তালাবদ্ধ, অনেক যন্ত্রে জমেছে ধুলার আস্তর, কোথাও কোথাও মাকড়সার জাল।
বেড়ার হাতিগাড়া মহল্লার তাঁতি আক্তার হোসেন বলেন, ‘আগে এই মহল্লায় দেড় হাজারের মতো তাঁত চলত। এখন আমার একটাসহ চার-পাঁচটি ছাড়া সব তাঁত বন্ধ। ঈদের আশায় যে একটা চালু রাখছি, সেটায় লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠতেছে না। ঈদের পর এই তাঁতটাও বন্ধ কইর্যা দেওয়া লাগবি মনে হতেছে।’
খরচ বাড়লেও বাড়েনি পণ্যের দাম
তাঁতিরা বলছেন, সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি শাড়ি-লুঙ্গির দাম। ফলে উৎপাদন খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ঈদের বাজারে লুঙ্গির দাম প্রতি থানে (চারটি) মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। অথচ খরচ বিবেচনায় দাম বাড়া উচিত ছিল অন্তত ১০০ টাকা। ফলে নতুন উৎপাদিত কাপড় ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারছেন না তাঁতিরা।
তাঁতিদের অভিযোগ, এবারের রমজানের আগে শাড়ি-লুঙ্গির দাম কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু রমজান শুরুর পর দাম পড়ে গেছে। বাজারে কাপড়ের চাহিদার তুলনায় সরবরাহও বেড়েছে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে কাপড় বিক্রি করেছেন।
তাঁতশ্রমিকদের দুর্ভোগ
এই সংকটে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন তাঁতশ্রমিকেরা। তাঁরা বলেন, এক থান (চারটি) মাঝারি মানের লুঙ্গি বুনে তাঁরা পান প্রায় ১০০ টাকা। দিনে দুই থেকে তিন থান বুনতে পারলে তাঁদের আয় দাঁড়ায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
বেড়ার জগন্নাথপুর গ্রামের তাঁতশ্রমিক বাদশা মোল্লা বলেন, ‘দিনে ২ (৮টি) থেকে ৩ (১২টি) থানের বেশি লুঙ্গি বোনা যায় না। এতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কামাই হয়। এই টাকায় পরিবারের সগলের ভালোমতো খাওয়ার খরচই জোটে না। চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচের টাকা তো জোগাড় করব্যারই পারি না। এ অবস্থায় ঈদের আনন্দের কথা ভাববো কীভাবে?’
সাঁথিয়ার ছেঁচানিয়া গ্রামের আরেক তাঁতশ্রমিক বাবুল আলী বলেন, ‘ঈদ আসতেছে, কিন্তু নতুন কাপড় কিনার চিন্তাও করতেছি না। এই ঈদে আনন্দ নাই।’
ঋণের চাপে পেশা ছাড়ছেন তাঁতিরা
লোকসানে অনেক তাঁতি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ মহাজনের চাপ সামলাতে না পেরে এলাকা ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছেন। কেউ ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ গার্মেন্টসে কাজ নিচ্ছেন।
বেড়ার পেঁচাকোলা গ্রামের তাঁতি ইউসুফ আলী বলেন, ‘তাঁত চালাব্যার যায়া বেশির ভাগ তাঁতি ঋণ হয়া তাঁত বন্ধ কইর্যা দিছে। আমার মাথার ওপরেও ঋণ। তারপরেও কোনোরকমে আমার দুইখান তাঁত চালু রাখছি। কিন্তু আমাগরে গ্রামের বেশির ভাগ তাঁতই বন্ধ হয়া গেছে। অনেকেই অন্য পেশায় চইল্যা গেছে।’
সাঁথিয়ার ছেঁচানিয়া গ্রামের তাঁতি রহম আলী বলেন, তাঁত চালাতে গিয়ে তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ হয়। এখন সেই ঋণের চাপ সামলাতে ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন।
দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য
একসময় বেড়া-সাঁথিয়া অঞ্চলে ৩০ হাজারের বেশি তাঁত চালু ছিল। এখন তা কমে সাত-আট হাজারে নেমে এসেছে। এর মধ্যেও অনেকগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।
বেড়ার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের মালদাপাড়া (৬ নম্বর ওয়ার্ড) ও পেঁচাকোলা (৪ নম্বর ওয়ার্ড) গ্রাম একসময় তাঁতপ্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম ও সেল্টু মিয়া বলেন, অন্যান্য বছর ঈদ এলেই বন্ধ তাঁতগুলো চালু হয়ে যেত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, চালু তাঁতও টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তাঁরা বলেন, একসময় এই দুই ওয়ার্ডে প্রায় দুই হাজার তাঁত সচল ছিল, যেখানে ছয় থেকে সাত হাজার তাঁতশ্রমিক কাজ করতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক থেকে দেড় শ তাঁতে, যেগুলোও কোনোরকমে টিকে আছে।
ঈদের সময় যখন চারদিকে উৎসবের আমেজ থাকার কথা, তখন এই দুই ওয়ার্ডের তাঁতপল্লিতে নেমে এসেছে নীরবতা। জীবিকার তাগিদে পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁতিরা। আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বহুদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
সাঁথিয়া উপজেলা মাধ্যমিক তাঁতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রহম আলী বলেন, তাঁতিদের এমন দুরবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। সাঁথিয়া উপজেলার অর্ধেকের বেশি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চলছে সেগুলোও লোকসানে চলছে। এতে তাঁতিরা চরম অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি সহায়তা ছাড়া এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।