
অভাবের সংসারে একমাত্র ভরসা ইজিবাইক হারিয়ে শিশু সিয়াম যখন চিৎকার করছিল, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি পথচারীরা। যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করেছেন। শিশুটি কষ্ট নিয়ে বাড়িতে ফেরার পর সুখবর পেয়েছে। তার হারিয়ে যাওয়া ইজিবাইকটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে কিছু যন্ত্রাংশ খোয়া গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, খোয়া যাওয়া মালামাল নতুন করে ইজিবাইকে লাগানোর কাজ চলছে। তারপর শিশুটির হাতে ইজিবাইকটি তুলে দেওয়া হবে। ঘটনা জানার পর আশ্বস্ত হয়ে ইজিবাইক ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে সিয়াম।
সংসারের ভার ও অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ১২ বছরের শিশু সিয়াম আহমেদ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ছিনতাইকারী চক্র তাকে ফাঁদে ফেলে ইজিবাইকটি নিয়ে পালিয়ে যায়। পরিবারের একমাত্র আয়ের মাধ্যম হারিয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি করে কাঁদছিল সিয়াম। সিয়ামের কান্না পথচারীদের হৃদয়ে কাঁপন তুলেছিল, মর্মাহত হয়েছেন অনেকে।
ঘটনাটি গত শনিবার দুপুর ১২টার দিকে কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মধুগঞ্জ বাজারের। রাস্তায় গড়াগড়ি করে বিলাপ করার সময় পথচারীরা তার কাছে গিয়ে জানতে পারেন, তার ইজিবাইকটি নিয়ে পালিয়েছে একটি চক্র। কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়া সিয়ামকে স্যালাইন ও পানি পান করিয়ে সুস্থ করে তোলেন তাঁরা। সন্ধ্যার দিকে তাঁরা সিয়ামের পরিবারের খোঁজ পান। পরে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেন।
সিয়াম ঝিনাইদহ পৌর এলাকার কাঞ্চনপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা জাকির হোসেনের ছেলে এবং শহরের বেকাব্রিজ এলাকার মাদ্রাসাতুল তাকাওয়া আল ইসলামির হেফজ বিভাগের ছাত্র। জাকির হোসেন গত ছয় বছরে দুবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। শ্বাসকষ্ট, লিভারে পানি জমাসহ নানা রোগে অসুস্থ হয়ে চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে এখন শয্যাশায়ী। জাকিরের প্রতিদিন ১৮০ টাকার ওষুধ খেতে হয়। বেসরকারি সংস্থার ঋণের কিস্তি, সংসার খরচ ও বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে মাদ্রাসার পাঠ চুকিয়ে বাবার ইজিবাইক নিয়ে রাস্তায় নামে সিয়াম। দিনের বেলায় শহরের মধ্যে ও নিকট দূরত্বে ভাড়া ধরত। কিন্তু সেদিন তাকে ফাঁদে ফেলে ছিনতাইকারী চক্র।
বাবা অসুস্থ হওয়ায় সিয়ামের মা আগে মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসারের কিছু খরচ জোগাড় করতেন। কিন্তু এক বছর আগে সিয়ামের ছোট ভাই সাবিত আহমেদের জন্মের পর তিনি মানুষের বাড়িতে কাজও করতে পারেন না।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সিয়ামের মা নাছরিন খাতুন জানান, শনিবার সকাল সাতটার দিকে ইজিবাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় সিয়াম। ৯টার দিকে শহরের ব্যাপারীপাড়ার ফুলঘরের সামনে থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে শহরতলির লাউদিয়া গ্রাম থেকে লিচু আনার কথা বলে ইজিবাইকে ওঠেন দুই যাত্রী। তাঁরা লাউদিয়ায় গিয়ে লিচু এখনো পাড়া হয়নি জানিয়ে নলডাঙ্গায় যাওয়ার কথা বলেন। নলডাঙ্গায় পৌঁছে আরও দূরে যেতে চাইলে সিয়াম যেতে অস্বীকার করে। তখন তাকে থাপ্পড় দিয়ে সামনে যেতে বলেন তাঁরা। কালীগঞ্জ শহরের মধুগঞ্জ বাজারে যাওয়ার পর ইজিবাইক ঘুরিয়ে একটি গলির মধ্যে নিতে বলেন। কিন্তু এত ছোট রাস্তায় যেতে পারবে জানালে তাদের একজন ইজিবাইকের চাবি কেড়ে নিয়ে ঘুরিয়ে আনার কথা বলে সিয়াম ও সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তিকে নামিয়ে দেন। অনেক সময় পার হয়ে গেলেও ইজিবাইক ঘুরিয়ে না আনলে সঙ্গে থাকা লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করে সিয়াম। তিনিও সুযোগ বুঝে পালিয়ে যান। সিয়াম তখন বুঝতে পারে, তাকে ফাঁদে ফেলে ইজিবাইক নিয়ে পালিয়েছে চক্রটি।
নাছরিন খাতুন বলেন, সিয়াম তিন মাস ধরে ইজিবাইক চালালেও দু-এক ঘণ্টা পরপর বাড়িতে আসত। দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাড়িতে না ফেরায় তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে থাকেন। সন্ধ্যার দিকে সিয়ামের সন্ধান পাওয়া যায় কালীগঞ্জে। তিনি জানান, দুটি এনজিওতে ৭০ হাজার টাকার ঋণের কিস্তি দিতে হয়। কৃষি ব্যাংকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ঋণ আছে। স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ সব ইজিবাইকের ওপরে। তিন শতক জমির ওপর ভিটাবাড়ি ব্যাংকে বন্ধক রাখা। এ অবস্থায় ইজিবাইক হারিয়ে তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। এখন পুলিশ উদ্ধার করেছে শুনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। তবে বাইকটি এখনো হাতে পাননি।
সিয়ামদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের দুই কক্ষের একটি ঘরে বসবাস করে সিয়ামদের পরিবার। গত তিন মাস ছোট্ট সিয়ামের সামান্য উপার্জনেই পরিবারটি বেঁচে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
অসুস্থ জাকির হোসেন বলেন, ‘আমি প্রায় ১৫ বছর ইজিবাইক চালাই। আগে ভালোই সংসার চলত। ২০২০ সালে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়। পরে ২০২৫ সালে আবার হার্ট অ্যাটাক হয়। শ্বাসকষ্ট, লিভারে পানি জমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। শেষ তিন মাস আগে বিছানায় পড়ে যাই। প্রতিদিন ১৮০ টাকার ওষুধ লাগে। আমার ওষুধ ও সংসারের খরচ এই ইজিবাইক দিয়েই চালাচ্ছিল সিয়াম।’
স্থানীয় লোকজন বলেন, জাকিরের গ্রামের বাড়ি কোটচাঁদপুর উপজেলার জালালপুর গ্রামের মালোখালী পাড়ায়। জাকির সক্ষম থাকতে পরিবারটি আগে ভালোই চলত। ইজিবাইকটি ছিনতাই হওয়ায় একেবারে পথে বসে গিয়েছিল।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জেল্লাল হোসেন বলেন, তাঁরা ঘটনার পরদিনই ইজিবাইকটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। পাশের চৌগাছা এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে। তবে কিছু মালামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো মেরামতের কাজ চলছে। কাজ শেষে ইজিবাইকটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।