
ইরান যুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া জ্বালানি সংকটে কক্সবাজারের কৃষকেরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ার পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিং এর কারণে সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। অনেক স্থানে ধান গাছের জমি শুকিয়ে গেছে। এ অবস্থায় বোরো চাষ নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের নয়াপাড়ায় তিন একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন কৃষক সাইফুল আলম (৪৮)। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রোপণ করা ধানের চারায় দৈনিক দুই বেলা সেচের পানি সরবরাহ করতে হয়। মাটির নিচ থেকে পানি তোলার জন্য খেতের এক পাশে তিনি ৫ ঘোড়ার (অশ্বশক্তি) ডিজেলচালিত অগভীর বা শ্যালো পাম্প বসিয়েছেন। ৩ লিটার ডিজেল দিয়ে এক ঘণ্টা শ্যালো পাম্প চালালে ৩ একরের জমিতে সেচ যেত। কিন্তু ডিজেল–সংকটের কারণে এক মাস ধরে টানা এক ঘণ্টাও তিনি পাম্প চালাতে পারেননি। সাইফুল আলম বলেন, এমন অবস্থা আগামী ১০-১২ দিন চলতে থাকলে অধিকাংশ ধানগাছ মারা পড়বে।
কেবল নয়াপাড়া নয়, উপজেলার খুরুশকুলের পালপাড়া, তৈতয়া, ঝিলংজা ইউনিয়নের মুহুরিপাড়া, বাংলাবাজার, খরুলিয়া এলাকায় গিয়েও সম্প্রতি একই অবস্থা দেখা গেছে। প্রচণ্ড রোদে জমি ফাটতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে সেচসংকট।
২০-২৫ দিন ধরে জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি পাম্প ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। তাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে চাষিরা তাঁদের জানিয়েছেন। তা ছাড়া ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণেও পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছেআশীষ কুমার, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় সেচপাম্প আছে ৭ হাজার ১৪৬টি। এর মধ্যে ৫-২০ ঘোড়ার গভীর পাম্প ১০টি, ১-৫ ঘোড়ার শ্যালো পাম্প ৪ হাজার ৮৫২টি এবং ৫-১০ ঘোড়ার এলএলপি (লো লিপ পাম্প) আছে ২ হাজার ২৮৪টি। ৭০ শতাংশ পাম্প ডিজেলচালিত, অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেল দুটো দিয়ে চলে। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না। তাতে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক কৃষি সমিতির নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, ডিজেল–সংকটের কারণে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০টির বেশি সেচপাম্প বন্ধ আছে। এর ফলে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ঠিকমতো পানি সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জেলায় এবার বোরো ধানের চাষ হচ্ছে ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার প্রথম আলোকে বলেন, ২০-২৫ দিন ধরে জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি পাম্প ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। তাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে চাষিরা তাঁদের জানিয়েছেন। তা ছাড়া ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণেও পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কিছু পাম্প বিদ্যুৎ–চালিত।
আশীষ কুমার বলেন, গভীর পাম্প চালাতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৫ লিটার ডিজেল লাগে, লো লিপ পাম্পে লাগে ৪ লিটার এবং শ্যালোতে লাগে ২ লিটার তেল। গত ডিসেম্বর মাসে বোরো ধানের চাষ শুরু হয়েছে, ধান পাকবে মে-জুন মাসে। জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হলে ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় শঙ্কা রয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার জেলার ৯টি উপজেলায় ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। মাঠ থেকে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে সমপরিমাণ জমিতে চাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় সেচপাম্প আছে ৭ হাজার ১৪৬টি। এর মধ্যে ৫-২০ ঘোড়ার গভীর পাম্প ১০টি, ১-৫ ঘোড়ার শ্যালো পাম্প ৪ হাজার ৮৫২টি এবং ৫-১০ ঘোড়ার এলএলপি (লো লিপ পাম্প) আছে ২ হাজার ২৮৪টি। ৭০ শতাংশ পাম্প ডিজেলচালিত, অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেল দুটো দিয়ে চলে। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না। তাতে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দুশ্চিন্তায় কৃষক
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী গ্রামে দুই একর জমিতে বোরো চাষ করেন কৃষক সাদেক হোসেন। গত বছর খালের পানি দিয়ে ধান চাষ করেন। এবার খালের পানি শুকিয়ে গেছে। অন্যজনের সেচপাম্প থেকে পানি সরবরাহ নিয়ে এত দিন চলেছেন। ২০ দিন ধরে পাম্প থেকে ঠিকমতো পানি সরবরাহ নেওয়া যাচ্ছে না। তাতে চারাগুলো লালচে রং ধারণ করে। সাদেকুর রহমান বলেন, আগামী ১০-১৫ দিন ঠিকমতো পানি সরবরাহ দেওয়া না গেলে গাছ মারা যেতে পারে।
একই এলাকার কৃষক আবদুল নবী বলেন, বোরো চাষের জন্য তিনি প্রতি কানি (৪০ শতক) জমি ৬ হাজার টাকা দরে ইজারা নিয়ে চাষে নেমেছেন। ৬ কানিতে ইজারা দিতে হয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। সেচ সরবরাহের জন্য কানিতে ৩ হাজার করে ৬ কানিতে ১৮ হাজার টাকা, শ্রমিক খরচ ১০ হাজার, ইউরিয়া সার, কীটনাশক বাবদ তাঁর মোট খরচ হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু ধান উৎপাদন ব্যাহত হলে তাঁকে পথে বসতে হবে। টেকনাফ উপজেলায় এবার বোরো চাষ হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর। রামু, উখিয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, পেকুয়া উপজেলায়ও একই সংকট দেখা দিয়েছে।
চাষিরা জানান, সেচের পানির ওপর ৮০ শতাংশ বোরো চাষ নির্ভরশীল। সময়মতো সেচ দেওয়া না গেলে মাঝপথে ধানের চারা মরে যেতে পারে। রামুর ফতেখাঁরকুলের কৃষক আব্বাস উদ্দিন বলেন, গত কয়েক দিন উপজেলার তিনটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তিনি ১ লিটার ডিজেল পাননি। খুচরা বাজার থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫০ টাকায় কিনে কয়েক দিন পাম্প চালিয়ে পানি সরবরাহ করেছেন। সংকট দিন দিন বাড়ছে।