খাল পার হচ্ছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা
খাল পার হচ্ছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা

যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে যেভাবে ঈদ এসেছিল

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। কেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ সংগ্রামের সেই সময়ের ঈদের দিন, তা নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন চট্টগ্রামের প্রবীণ নাগরিকেরা। তাঁরা বলেছেন, মার্চ মাস থেকে চলা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, ধরপাকড়ের আতঙ্কের পাশাপাশি ছিল স্বাধীনতার জন্য আশাবাদ। এই দোলাচলের মধ্যেই ঈদ এসেছিল।

পতেঙ্গা বন্দর থেকে কালুরঘাট শিল্প এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়, নদী ও সাগরঘেরা চট্টগ্রাম শহর ১৯৭১ সালে আজকের মতো জনবহুল ছিল না। একাত্তরের মার্চের শেষ দিকে বন্দর, লালখান বাজার, হালিশহরসহ বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ভয় আর আতঙ্কের মধ্যেই চলছিল খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধ যুদ্ধ। এমন দমবন্ধ আর গুমোট এক সময়ে এসেছিল পবিত্র ঈদুল ফিতরও। একাত্তরের ২০ নভেম্বর ঈদের দিনটি কেমন ছিল, তা এ প্রজন্মের কারও জানা নেই। চট্টগ্রাম শহরের প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতিকথা ও মুক্তিযুদ্ধের নানা দলিল থেকে একটা চিত্র উঠে আসে।

১৯৫৪ সালে শহরের স্টেশন রোড এলাকার প্রাণকেন্দ্রে গড়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে আধুনিক বিপণিবিতান চট্টগ্রাম নিউমার্কেট। তখনো জহুর হকার্স মার্কেট চালু হয়নি। নিউমার্কেটের কথা বাদ দিলে রেয়াজুদ্দিন বাজারই ছিল শহরের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কেনাকাটার প্রধান কেন্দ্র। পবিত্র রমজানে এই দুই বিপণিকেন্দ্রে ভিড় তৈরি হতো মানুষের। দরজি দোকানগুলো অর্ডার নিতে হিমশিম খেত। কিন্তু একাত্তরে প্রায় ফাঁকাই ছিল এই দুই বাণিজ্যকেন্দ্র।

১৯৫৪ সালে শহরের স্টেশন রোড এলাকার প্রাণকেন্দ্রে গড়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে আধুনিক বিপণিবিতান চট্টগ্রাম নিউমার্কেট। তখনো জহুর হকার্স মার্কেট চালু হয়নি। নিউমার্কেটের কথা বাদ দিলে রেয়াজুদ্দিন বাজারই ছিল শহরের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কেনাকাটার প্রধান কেন্দ্র। পবিত্র রমজানে এই দুই বিপণিকেন্দ্রে ভিড় তৈরি হতো মানুষের। দরজি দোকানগুলো অর্ডার নিতে হিমশিম খেত। কিন্তু একাত্তরে প্রায় ফাঁকাই ছিল এই দুই বাণিজ্যকেন্দ্র।

একাত্তরের ঈদ নিয়ে কথা বলেছি শহরের বেশ কয়েকজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখকের সঙ্গে। প্রশ্ন ছিল, কেমন ছিল একাত্তরের ঈদের দিনটি? উৎসবের আমেজ ছিল কি? বাড়িতে কি রান্না হয়েছিল সেদিন? তাঁরা জানিয়েছেন, দেশে যুদ্ধ চলায় প্রথমত মানুষের হাতে টাকা ছিল না। আর যাঁরা সচ্ছল ছিলেন, তাঁরাও এমন পরিস্থিতিতে নতুন কাপড় কেনা সংগত মনে করেননি। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা ও শিশুদের জন্য যতটুকু করা প্রয়োজন, ততটুকুই করেছেন তাঁরা। তাতে উৎসবের রেশ ছিল না। উৎকণ্ঠা আর শোক ঢেকে দিয়েছিল ঈদের আনন্দ।

চট্টগ্রামের পানওয়ালা পাড়ার এ বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়কেন্দ্র বা শেলটার হাউস

চট্টগ্রাম শহরের কাজীর দেউড়ি এলাকায় সাহিত্য নিকেতন ভবনে থাকতেন কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আবুল ফজল এবং লেখিকা ও নারীনেত্রী উমরতুল ফজল দম্পতি। কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন তাঁদের পঞ্চম সন্তান। একাত্তরের অনেকটা সময় তিনি চট্টগ্রামে কাটিয়েছেন। ঈদের দিনও ছিলেন সাহিত্য নিকেতন ভবনে। এর মধ্যেই অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নানা সাংগঠনিক কাজে।

স্মৃতিকথামূলক বিখ্যাত বই ‘রেখাচিত্র’–এর লেখক আবুল ফজলের সাহিত্য নিকেতনের বাড়িটি শহরের কমবেশি সবার কাছেই পরিচিত ছিল। একাত্তরের ২৬ মার্চ সেই বাড়িতে গুলি এসে পড়ে। হালিশহরে ইপিআর ক্যাম্পে হামলা ও গণহত্যার পর ২৯ মার্চ নাগাদ চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়। তখন সেই বাড়িতে থাকা আর নিরাপদ মনে করেননি বাসিন্দারা।

স্মৃতিকথামূলক বিখ্যাত বই ‘রেখাচিত্র’–এর লেখক আবুল ফজলের সাহিত্য নিকেতনের বাড়িটি শহরের কমবেশি সবার কাছেই পরিচিত ছিল। একাত্তরের ২৬ মার্চ সেই বাড়িতে গুলি এসে পড়ে। হালিশহরে ইপিআর ক্যাম্পে হামলা ও গণহত্যার পর ২৯ মার্চ নাগাদ চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়। তখন সেই বাড়িতে থাকা আর নিরাপদ মনে করেননি বাসিন্দারা।

আবুল মোমেন বলেন, ‘২৬ মার্চ বাড়িতে গুলি লাগার পর আমরা আমাদের প্রতিবেশী কাজী বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পরে চট্টগ্রাম শহর ২৯ মার্চের পর যখন পুরোপুরি পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়, তখন আমরা সাতকানিয়ার গ্রামের বাড়ি চলে যাই। সেখানেই ছিলাম জুলাই মাস পর্যন্ত। পরে জুলাই মাসে পাকিস্তান সরকার সব ‘নরমাল’ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেয়। তখন আমরা চট্টগ্রামে এসে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠি। পরে সেপ্টেম্বর মাসে নিজেদের বাড়িতে আসি আবার। সেখানেই ঈদ করেছিলাম।’

চট্টগ্রাম নিউমার্কেট। গত শতকের ষাট–সত্তরের দশকে শহরের মধ্যবিত্ত লোকজনের কেনাকাটার প্রধান কেন্দ্রটি ছিল এটি

কেমন ছিল সেই ঈদের দিন? এ প্রশ্নের উত্তরে আবুল মোমেন বললেন, ‘একাত্তরে ভয়, আশঙ্কা আর আশাবাদের মধ্যে ঈদ এসেছিল। ভয় আর আশঙ্কা ছিল পাকিস্তানের দখলদার বাহিনী নিয়ে। তখন ঘরে ঘরে ছেলেরা নিখোঁজ। কেউ যুদ্ধে চলে গেছে, কেউ বাড়িতে থাকছে না। একটা চাপা আতঙ্ক সবখানে। আবার আশাবাদ ছিল স্বাধীনতা নিয়ে। আমাদের মনে হতো বিজয় খুব বেশি দূরে নয়।’

একাত্তরে নতুন কাপড় কেনেননি আবুল ফজলের পরিবারের কোনো সদস্য। ঘরে অন্য দিনের তুলনায় ভালো খাবার তৈরি হয়েছিল সেদিন। তবে কোনো বাড়তি উদ্‌যাপন ছিল না। ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামে।

‘আমরা ঈদের বেশ কিছুদিন আগে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে একটা প্রচারপত্র ছাপি। সেখানে পরাধীন দেশে ঈদে উৎসব বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। এই প্রচারপত্র আমরা নানা জায়গায় ঝুঁকি নিয়ে বিলি করেছি। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঈদ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না।’
মাহফুজুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক।

হত্যা ও ধ্বংসের শহর

চট্টগ্রাম শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। খুলনায় অবস্থিত ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’–এর ট্রাস্টি ও গবেষক চৌধুরী শহীদ কাদের এক প্রবন্ধে চট্টগ্রামের গণহত্যা নিয়ে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন।

চৌধুরী শহীদ কাদের লিখেছেন, একাত্তরের মার্চ থেকে শুরু হয়ে বিজয়ের আগমুহূর্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে লাগাতার গণহত্যা চালিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। কত মানুষ শহীদ হয়েছিলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। দৈনিক আজাদী ১৯৭২-এর এপ্রিলের একটি সংখ্যায় চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা পাঁচ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ভারতের অমৃতবাজার পত্রিকা ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার সংবাদ ছাপায়। চট্টগ্রামে গণহত্যায় এক লাখ লোক মারা যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই পত্রিকা ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর আরেকটি প্রতিবেদনে গণহত্যায় চট্টগ্রামে চার লাখ লোককে হত্যা করার সংবাদ প্রচার করে।

চৌধুরী শহীদের এ বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক মাহফুজুর রহমানের কথায়। পেশায় চিকিৎসক মাহফুজুর রহমান ১৯৮০–এর দশক থেকে চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন। চট্টগ্রামের চকবাজারের গুলজার এলাকায় নিজের চেম্বারে বসে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমি এ মুহূর্তে চট্টগ্রামের শহীদের সংখ্যা নিয়ে কাজ করছি। কাজটি আগামী বছর শেষ হবে। তবে এযাবৎ যত কাজ করেছি, তথ্য পেয়েছি, তাতে একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। একটা চিত্র উঠে আসছে।’

একাত্তরের মার্চ থেকে শুরু হয়ে বিজয়ের আগমুহূর্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে লাগাতার গণহত্যা চালিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। কত মানুষ শহীদ হয়েছিলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। দৈনিক আজাদী ১৯৭২-এর এপ্রিলের একটি সংখ্যায় চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা পাঁচ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ভারতের অমৃতবাজার পত্রিকা ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার সংবাদ ছাপায়। চট্টগ্রামে গণহত্যায় এক লাখ লোক মারা যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই পত্রিকা ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর আরেকটি প্রতিবেদনে গণহত্যায় চট্টগ্রামে চার লাখ লোককে হত্যা করার সংবাদ প্রচার করে।

মাহফুজুর রহমান বলেন, মার্চ মাস থেকে চট্টগ্রামের বন্দর, হালিশহর, আমবাগান, ওয়ারলেস, ঝাউতলা, ফিরোজশাহ কলোনি, লালখান বাজার, রৌফাবাদ, আমিন জুটমিলসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় গণহত্যা হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমবাগানসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় নালা ও ম্যানহোলের ভেতর থেকেও প্রচুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে লাখের ওপর মানুষ খুন হয়েছিলেন। অনেক এলাকাকে মানুষ নিরাপদ ভেবেছেন। তবে সেখানেও হত্যাকাণ্ড চলেছে। এসব ছিল একেবারে ঠান্ডা মাথার ও পরিকল্পিত গণহত্যা। এটা এমন নয় যে আকাশ থেকে বোমা পড়ে মানুষ মারা গেছে। এসব ছিল বেছে বেছে পরিকল্পিতভাবে খুন।

কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন

উৎসব বর্জনের ডাক

একাত্তরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের (ফিফথ ইয়ার) ছাত্র ছিলেন মাহফুজুর রহমান। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহে হলেও লেখাপড়ার সূত্রে থাকতেন চট্টগ্রামে। মার্চ মাসেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন তিনি। ভারতে দুই দফা প্রশিক্ষণ নিয়ে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের শুরুতে আন্দরকিল্লার একটি অস্ত্রের দোকান থেকে অস্ত্র লুট করেন। থাকতেন শহরের মোগলটুলী এলাকার একটি শেল্টার হাউসে। সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ওই শেল্টার হাউসেই ঈদের দিনটি কেটেছে তাঁর।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক মাহফুজুর রহমান ঈদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ঈদে আনন্দের কোনো অনুভূতিই ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল, ঈদ উদ্‌যাপন করতে তাঁরা যেন বাড়ি না যান। ধরা পড়ার ভয় থাকায় এমন নির্দেশনা ছিল। তাই ঈদ কখন এল–গেল, সেটা বুঝতে পারেননি তাঁরা। কোনো বিশেষ আয়োজনও ছিল না।

পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ঈদে উৎসব আয়োজন বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমরা ঈদের বেশ কিছুদিন আগে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে একটা প্রচারপত্র ছাপি। সেখানে পরাধীন দেশে ঈদে উৎসব বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। এই প্রচারপত্র আমরা নানা জায়গায় ঝুঁকি নিয়ে বিলি করেছি। তা ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঈদ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না।’

‘আমার মাথায় জিন্নাহ টুপি, গায়ে কালো পোশাক। সেই সময় রাজাকারদের ইউনিফর্ম ছিল কালো পোশাক। মায়ের নির্দেশে আমরাও বাইরে গেলে তাই কালো পোশাক পরে যেতাম। ঈদের দিন মিলিটারির ডাক পেয়ে ভড়কে যাই। কয়েক পা এগোতেই এক সেনা হেসে বলল, “ঈদ মোবারক নেহি বোলগে?”’
মুহাম্মদ শামসুল হক, ইতিহাস গবেষক ও সাংবাদিক

কান্নার স্মৃতিটুকু মনে আছে

চট্টগ্রাম থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার দূরত্বে পটিয়া উপজেলা। সেখানকার মনসা গ্রামে থাকতেন কবি ওমর কায়সার। একাত্তরে তাঁর বয়স ৭-৮ বছর হবে। ওমর কায়সার বলেন, ‘আমার মেজ আপার বিয়ে হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ। বিয়ের তিন দিন পরেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সে কারণে শ্বশুরবাড়ি থেকে আর বাপের বাড়ি নাইয়র আসতে পারেনি আপা। আমাদের বাড়ি পটিয়া থানার মনসা গ্রামে। আপার শ্বশুরবাড়ি বোয়ালখালী থানার প্রান্তে সৈয়দপুর গ্রামে। বেশ দূর। মাঝখানে দুই থানার ১০–১২টা গ্রাম। রিকশায় যেতে লাগত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। সে বছর ঈদের দিনে মা আপার জন্য খুব কেঁদেছিলেন। মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি আটকে পড়েছে। কেউ দেখতে যেতে পারেনি। ঈদের দিনে কেমন করছে, কীভাবে কাটাচ্ছে—এসব নিয়ে মা সকাল থেকে কাঁদতে শুরু করেছিলেন। এখনো সেই কান্নার স্মৃতিটুকু মনে আছে।’

১৯৭১ সালের ঈদের দিনের আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়ে ওমর কায়সারের। তিনি বলেন, ‘আমাদের পাড়ার এক চাচাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাঞ্জাবি সৈন্যরা। সেই চাচার দুই ছেলে বাবাকে ছাড়া প্রথম ঈদ করছে। বাবার কবরের সামনে গিয়ে তাদের আহাজারি দেখেছিলাম। ওদের কান্না দেখে আমি বাবার দিকে একবার তাকিয়েছিলাম। বাবা আমাকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরেন।’

পটিয়ারই আরেকটা গ্রাম আল্লাই কাগজিপাড়ায় থাকতেন ইতিহাস গবেষক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ শামসুল হক। প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণামূলক লেখায় তিনি লিখেছিলেন, ১৯৭১ সালে ভয় ধরানো অস্বস্তিকর পরিবেশে ঈদ এসেছিল। উৎসবের লেশমাত্র ছিল না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক মাহফুজুর রহমান

১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল শামসুল হকের মেজ ভাই পাকিস্তানিদের বিমান হামলায় মারা যান মাত্র ২৫ বছর বয়সে। এ ঘটনার পর তাঁর পরিবারে স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতেন তাঁর মা-বাবা।

প্রথম আলোর স্মৃতিচারণায় শামসুল হক লিখেছিলেন, ‘একাত্তরের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে রোজা শুরু হয়। আমি তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। পড়ি রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয়ে। রোজার মাসে ঘরে বসেই দিন কাটছিল আমার। বড় ভাই বন্দরের কর্মকর্তা, সপ্তাহে দুই-তিনবার বাড়িতে আসতেন। আসার সময় বাজার নিয়ে আসতেন। রোজায় তাঁর আনা ছোলা, চিড়া খেতাম আমরা। কখনো কখনো কলা পেতাম। আর সাহ্‌রিতে দুধভাত। সে সময় তারাবিহর নামাজ পড়তে গেলে দেখতাম—বাড়তি কোনো আলাপ নেই। দু-একটা ফিসফাস শুনতাম। লোকে মন খুলে কথা বলতে ভয় পেত। কেবল কর্তব্য পালন করতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে মসজিদে এসেছিলেন অনেকে। এভাবেই রোজা শেষ হয়ে ঈদ এল। সেবার পবিত্র ঈদুল ফিতর ছিল ২০ নভেম্বর। পটিয়ায় মূল জামাত হয় রাহাত আলী স্কুলের মাঠে। পরিস্থিতির কারণে আমরা এত দূরে যাইনি। বাড়ির পাশের আমান আলী চৌধুরী মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েছি। বড় ভাই জাহেদুল হকের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। পরনে ছিল পুরোনো কালো রঙের জামা আর জিন্নাহ টুপি। ঈদ উপলক্ষে নতুন পাঞ্জাবি কেনা হয়নি, তাই ওই জামা পরেই ঈদগাহে যাই।’

স্মৃতিচারণায় শামসুল হক লেখেন, ‘ঈদের দিন বাড়িতে দুধের সেমাই আর চুটকি পিঠা রান্না হয়েছিল। ঈদের বিশেষ খাবার বলতে এটুকুই। সকালে ঈদের নামাজ পড়ে সেমাই খেয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে গেলাম এক আত্মীয়ের বাড়িতে। পথে একটা সেনাক্যাম্প পড়ে। সেখানে কয়েকজন মিলিটারি দেখে আমরা দুরুদুরু বুকে এগোতে লাগলাম। আমার মাথায় জিন্নাহ টুপি, গায়ে কালো পোশাক। সেই সময় রাজাকারদের ইউনিফর্ম ছিল কালো পোশাক। মায়ের নির্দেশে আমরাও বাইরে গেলে তাই কালো পোশাক পরে যেতাম। ঈদের দিন মিলিটারির ডাক পেয়ে ভড়কে যাই। কয়েক পা এগোতেই, এক সেনা হেসে বলল, “ঈদ মোবারক নেহি বোলগে?’’’