প্রায় ১০ বছর ধরে এই ঘরে বসবাস করছেন দুই ভাই–বোন। আগধল্যা গ্রাম, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রায় ১০ বছর ধরে এই ঘরে বসবাস করছেন দুই ভাই–বোন। আগধল্যা গ্রাম, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাইকে নিয়ে থাকেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বোন, মানুষ দিলে জোটে খাবার

কলাগাছ আর ঝোপঝাড়ের মধে৵ দোচালা জংধরা একটি মাত্র টিনের ঘর। টিনের বেড়াও জোড়াতালি দেওয়া। দূর থেকে দেখে মনে হয় পরিত্যক্ত ঘর। এই ঘরেই থাকেন দুই ভাই–বোন—শারীরিক প্রতিবন্ধী শফিকুল খলিফা (৪৭) ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা আক্তার (৩৯)। প্রতিবেশীরা খেতে দিলে ভাই–বোনের খাবার জোটে, না হয় থাকতে হয় উপোস।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের আগধল্যা গ্রামের প্রতিবন্ধী ভাইবোনের এমন দুর্বিষহ জীবন যে কাউকে নাড়া দেবে।

অবশ্য ভাই–বোনের জীবনের শুরুটা এতটা কঠিন ছিল না। এলাকাবাসী জানান, ওই গ্রামের মুদিদোকানি রশিদ খলিফার সংসারে তেমন অভাব ছিল না। প্রায় ২৫ বছর আগে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে মারা যান তিনি। এর পরই যেন সবকিছু বদলে যায়।

বাবার মৃত্যুর পর শফিকুলের কাঁধে সংসারের বোঝা চাপে। তিনি রিকশা চালিয়ে আয় করতে থাকেন। এরই মধ্যে বড় ভাই মজিদ খলিফা বিয়ে করে পাশের সখিপুরে চলে যান। প্রায় ১০ বছর আগে হঠাৎ শফিকুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে তাঁর হাত-পা একটু বেঁকে গেলে চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থকষ্টে ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারেননি।
প্রায় আট বছর আগে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে শফিকুলের মা মালেকা বেগম মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর সংসারের অভাবের তাড়নায় ছোট বোন সমতা আক্তার আত্মহত্যা করেন। এতে পুরো পরিবারটি একেবারেই বিপর্যন্ত হয়ে পড়ে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা আক্তার ভাইকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

গতকাল শুক্রবার প্রতিবেশী শাকিল খলিফার মাধ্যমে শফিকুল ও ফাতেমার সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান এই প্রতিবেদক। কিছু সময় অপেক্ষার পর ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন ফাতেমা। সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলে দরজার সামনে থেকে ফাতেমা একাধারে বলতে থাকেন, ‘মাইনষে খাওন দ্যায়। দিলে খাই। কষ্ট অইলে আর কী করুম। কিছুই নাই। ওর বাতাস নাগছে (অশুভ কিছু স্পর্শ করেছে)। মানুষের যে বাতাস নাগে, সেই বাতাস।’

মেঝের একপাশে বিছানো পুরোনো চাদরে শুয়ে থাকেন শফিকুল খলিফা। ফাতেমা আক্তার থাকেন ভাঙাচোরা চৌকিটাতে। আগধল্যা গ্রাম, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঘরের দরজা থেকে দেখা যায়, মেঝের একপাশে বিছানো পুরোনো চাদরে শুয়ে আছেন শফিকুল। ভেতের ঢুকতেই উঠে বসেন। তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আগে রিকশা চালাইছি, আটে-বাজারে (হাট–বাজারে) গেছি, কামও করছি। বুঝাও আনা হারছি (বোঝা বহন করতে পেরেছি)। পাও টইলা (পা বেঁকে) ন্যাংড়া অইলাম। ভালো শরীল, ভিতরে ভালোই; কি অইলো জানি না।’

শফিকুলের অনেক কথাই মুখে জড়িয়ে যায়। এর মধ্যে বললেন, ‘ভাত বোইনে দিছিলো। আমার ইচ্ছা অয় বাইরে যাই। আটা হারি (হাঁটতে পারি) না তো। ডাক্তারের কাছে নেয় নাই।’

প্রতিবেশী গৃহবধূ সুলতানা বেগম বলেন, ‘এত অভাবে কেউ থাকে তা দেহি নাই। হ্যারা কী খায়, কী পরে! দশজনে দিলে খ্যায়া হারে (খেতে পারে)। কেউর কাছে তো চ্যাহাও (চাইতেও) পারে না। জোয়ান পোলাহান প্রতিবন্ধী অইছে।’

মন চাইলে হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের দরজা পর্যন্ত আসেন শফিকুল। বোনের সহায়তা ছাড়া প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কাজটাও করতে পারেন না। এ ছাড়া টিনের এই ঘরটা ছাড়া নেই রান্নাঘর ও শৌচাগারও।

গ্রামের কয়েক ব্যক্তি ও প্রবাসীদের সহায়তা ভাইবোনের জন্য রান্নাঘর ও শৌচাগারসহ একটি আধা পাকা ঘর করে দিতে প্রায় এক লাখ টাকা জোগাড় করা হয়েছে বলে জানান প্রতিবেশী শাকিল খলিফা। আরও প্রায় চার লাখ টাকার প্রয়োজন। তাঁর আগে দুজনেরই চিকিৎসা করানো দরকার বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নজরে আনলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, এ দুজনের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর তাঁদেরকে সরকারি ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোবারক হোসেন।