হাওরাঞ্চলের একটি বড় অংশের ধান কিশোরগঞ্জের ভৈরব মোকামে বিক্রি হয়। এই মোকামে কোটি টাকার ধান কেনাবেচা হয়।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব মোকাম। গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ থেকে ২ হাজার ২০০ মণ ধান নিয়ে মোকামের ঘাটে ভেরে দিদার–২ নামের একটি নৌকা।
নৌকায় থাকা সব ধানই মোটা (হিরা জাত)। এই মোটা ধান গত বুধবার বাজারে বিক্রি হয়েছে ৭৭৫ থেকে ৭৮৫ টাকা মণ দরে। অথচ গত বছরের এই সময়ে হিরা ধানের সর্বোচ্চ মূল্য গেছে ৬৫০ টাকা। গত বছরের চেয়ে মণপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা বেশি হওয়ায় কৃষকরা বেশ খুশি।
আজমিরীগঞ্জের কৃষক সাবির উদ্দিন। তিনি এবার দুই একর জমিতে ব্রি-২৮ আর তিন একর জমিতে হিরা ধান ফলান। চিটায় ২৮ ধানের ফসলহানি হয়। তবে হিরায় প্রত্যাশিত ফলন এসেছে। তিনি বলেন, ‘ব্রি–২৮ ধানে কুবাতাস লাগছে। চিটায় ধরছে। এই ক্ষতি অনেক বড়। তবে হিরা ধানের ফলন ভালা। বাজারও ভালা। বাজারটা আর একটু উঠলে ২৮ ধানের দুঃখ হিরাতে ভুলা যেত।’
দিদার-২ নৌকার মাঝি আপেল মিয়া। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল আজমিরিগঞ্জ হাওরে যাঁরা এবার ব্রি–২৮ জাতের ধান লাগিয়েছিলেন তাঁদের সবার ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। তবে অন্যান্য ধানের ফলন ভালো হয়েছে।
এক সপ্তাহ আগ থেকে মোটা ধান কাটা শুরু হয়। আজমিরিগঞ্জের কৃষক ও ব্যাপারীরা জানতে পারেন ভৈরব ও আশুগঞ্জ মোকামে নতুন ধানের দাম ভালো। এই কারণে কাটা শুরু হওয়ার পর থেকে বাজারজাতের জন্য বেশির ভাগ ধান এই দুই মোকামে আনা হচ্ছে। এক দিন পর পর তিনি গড়ে দুই হাজার মণ করে ভৈরব মোকামে ধান নিয়ে আসছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাধীনতার আগ থেকে হাওরাঞ্চলের বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি, হবিগঞ্জের দিরাই, লাখাই, আজমিরিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কিছু অংশের বাণিজ্য ভৈরবনির্ভর। যুগ যুগ ধরে নদীপথে ভৈরবের সঙ্গে ওই সব অঞ্চলের অর্থনৈতিক যোগসূত্র তৈরি হয়ে আছে। বিশেষ করে হাওরকে ঘিরে ভৈরবে সমৃদ্ধ ধানের মোকাম প্রতিষ্ঠা হয়।
এই মোকাম থেকে ধানের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, লালমনিরহাট, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলার ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকেরা ধান কিনে নিয়ে যান। এবার ভৈরব মোকামে নতুন ধানের আমদানি শুরু হয় ২৭ চৈত্র থেকে। সব হাওরে ব্রি-২৮ ধানে চিটা হয়েছে। ২৯ ধানেও ফলন ভালো হয়নি।
গত বুধবার সকালে মোকামে গিয়ে দেখা যায়, হাওর থেকে নদী পথে আসা একাধিক নৌকা ঘাটে ভিরেছে। শ্রমিকরা নৌকা থেকে ধান খালাস করে ঘাটে রাখছেন। ঘাটেই কেনাবেচা হচ্ছে। ভৈরব মোকামে আসা প্রায় সব ধানই মোটা। ব্রি-২৮ কিংবা ২৯ ধান এখনও আসা শুরু হয়নি। বেশির ভাগ ধান আসছে আজমিরিগঞ্জ হাওর থেকে।
আজমিরিগঞ্জ থেকে দেড় হাজার মণ ধান নিয়ে আসা এশু মাঝি বলেন, হাওরের জমি এক ফসলি। আর ফসল বলতে ধান। ফলন ও দাম ভালো হলে বছরটা ভালো যায়। তাঁরাও ভালো থাকেন। ব্রি– ২৮ ধানে মার খাওয়ায় মনে হয়েছিল এবার সব শেষ। এখন মোটা ধানে দাম ভালো হওয়াতে আশা এখনও বেঁচে আছে। কয়েক দিন পর থেকে পুরোদমে কাটা শুরু হলে আমদানি আরও বাড়বে।