
বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে বরণ করে নিতে বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, পান্তা-ইলিশ খাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—কতই–না আয়োজন হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে বর্ষবরণের এসব আয়োজন শুরু হবে শহরের আদালত চত্বরের বটতলায় নিক্বণ সংগীত বিদ্যালয়ের সুরের মূর্ছনায়।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সংগঠনটি ৫৪ বছর ধরে ঠাকুরগাঁওয়ে আয়োজন করে যাচ্ছে বর্ষবরণের প্রভাতি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আগে বটতলা সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। ছায়ানটের আদলে তৈরি করা হয় মঞ্চ।
মঙ্গলবার নববর্ষের প্রথম সূর্যকে স্বাগত জানিয়ে রাগভৈরবীর সুরের মূর্ছনায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হবে। এরপর একে একে চলবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন ও রজনীকান্ত সেন—পঞ্চকবির গান পরিবেশনের পাশাপাশি থাকে আবৃত্তি, তবলা, সেতার ও সরোদের যন্ত্রসংগীত। এ ছাড়া লালনসংগীত, লোকগান ও ভাওয়াইয়া পরিবেশিত হয়। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে আয়োজন।
নিক্বণের প্রভাতি অনুষ্ঠানের পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ থেকে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এতে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন। সেখানে দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নববর্ষকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
নিক্বণ সংগীত বিদ্যালয়ের সংগীত শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দীপঙ্কর বসু জানান, ১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণের এই আয়োজন শুরু হলেও এর আগে ‘নিক্বণ কালচারাল সেন্টার’ নামের একটি সংগঠন ১৩৭০ বঙ্গাব্দ (১৯৬৩ সাল) থেকেই এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছিল। শুরুতে স্থানীয় সাধারণ পাঠাগার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানটি হতো। অংশগ্রহণ বাড়তে থাকায় ১৯৯৮ সালে স্থান পরিবর্তন করে আদালত চত্বরের বটতলায় আনা হয়।
দীপঙ্কর বসু আরও জানান, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে সংগীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। বর্ষবরণের এই আয়োজনে তারাই অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে (১৯৭২ সাল) ঠাকুরগাঁওয়ে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে আগ্রহী একদল সংস্কৃতিমনা মানুষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় নিক্বণ সংগীত বিদ্যালয়। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক মন্ত্রী মির্জা রুহুল আমিন, হরিদাস গুহঠাকুরতা, বলরাম গুহঠাকুরতা, ফজলুল করিম, আকবর হোসেনসহ অনেকে এই উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠার বছর পয়লা বৈশাখেই এই আয়োজনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
সোমবার বিকেলে বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, পয়লা বৈশাখের প্রভাতি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। চলছে জোর মহড়া। সে সময় একফাঁকে কথা হয় বিদ্যালয়টির সদস্য ও বাংলাদেশ বেতার ঠাকুরগাঁওয়ের রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী নিশাত শারমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ সাল থেকে আমি বর্ষবরণের এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছি। আর এখন তো আমার সঙ্গে দুই মেয়েও অংশ নেয়। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারার অনুভূতিটাই অন্য রকম।’
প্রভাতি অনুষ্ঠানের নিয়মিত দর্শক লেখক রাজা সহিদুল আসলাম। তিনি বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে নিক্বণের প্রভাতি অনুষ্ঠানটির ভূমিকা ব্যাপক। দেশের এই সংকটে বর্ষবরণে সমন্বিত অংশগ্রহণ আমাদের ঐক্যের পথ দেখায়।’
শহরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলা বর্ষের প্রথম দিনে নিক্বণের বর্ষবরণ আয়োজনে অংশ নিতে আমরা অপেক্ষা করে থাকি। এই পরিবেশনা আমাদের বিমোহিত করে।’
নিক্বণের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক দেব কুমার গুহ ঠাকুরতা বলেন, ‘মফসসল শহরে এ ধরনের আয়োজন বিরল। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা এটি চালিয়ে যাচ্ছি। দর্শকের ভালোবাসা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।’