কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার কালারমার মসজিদ। সম্প্রতি তোলা
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার কালারমার মসজিদ। সম্প্রতি তোলা

গম্বুজবিহীন সাদা মসজিদটিতে কেন দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন মুসল্লিরা

কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের প্রাচীন মসজিদ কালারমার মসজিদ। আয়তাকার সাদা রঙের গম্বুজবিহীন একতলা এই মসজিদে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন নামাজ আদায় করতে আসেন। লোকজ নির্মাণশৈলীর এই মসজিদে যোগ হয়েছে ঔপনিবেশিক রীতিও।

চুন–সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি গম্বুজবিহীন আয়তাকার সাদা মসজিদ ভবন। ভবনের চার কোনায় চারটিসহ ছোট–বড় ১৭টি মিনারের এই মসজিদ কয়েক শতাব্দী পুরোনো বলে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপবাসীর ধারণা। সঠিক বয়স জানা না গেলেও স্থানীয় লোকজনের মতে, এটিই দ্বীপের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ। মসজিদের নাম কালারমার মসজিদ। প্রচলিত আছে, এই মসজিদে মানত করলে পূর্ণ হয় মনস্কামনা। এ জন্য দূরদূরান্ত থেকে মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতে আসেন মুসল্লিরা।

কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের ধুরুং বাজারের কাছেই কালারমার মসজিদের অবস্থান। অনেকে বলেন, মসজিদটি প্রায় পাঁচ শ বছরের পুরোনো। কয়েক শতাব্দী আগে বাঁশ আর গোলপাতার ছাউনি দিয়ে মসজিদটি তৈরি হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা সংস্কার আর পুনর্নির্মাণের পর বর্তমান রূপ পেয়েছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, এলাকার একজন অবস্থাপন্ন ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীর নামে ওই মসজিদ তৈরি করেন। ওই ব্যক্তির স্ত্রীর নাম অনুসারের মসজিদের নামকরণ করা হয় কালারমার (কালার মায়ের) মসজিদ।

মসজিদটিতে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে ৬০০-৭০০ মুসল্লির সমাগম ঘটে। অন্যান্য দিন নামাজের সময় মুসল্লি হয় ২৫০-৩০০ জন, তা ছাড়া মানত করতে প্রাচীন এই মসজিদে ছুটে আসেন জেলার পেকুয়া, চকরিয়া, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারাসহ বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ।

ধুরুং বাজার এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ও কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আলম সিকদার নিয়মিত কালারমার মসজিদে নামাজ আদায় করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কালারমার মসজিদ এই সাগরদ্বীপের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। তবে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদের ইতিহাস, নামকরণ–সম্পর্কিত সঠিক তথ্য কোথাও উল্লেখ নেই।

উত্তর ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইট ও অনলাইন মাধ্যম ঘেঁটে দেখা গেছে, কয়েক শ বছর আগে বাঁশের বেড়া ও গোলপাতার ছাউনি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এরপর ১৮৭৬ সালের দিকে মসজিদটিকে সেমিপাকা টিনের ছাউনিতে উন্নীত করেন এলাকার জমিদার শেখ মুহাম্মদ মনু সিকদার। পরে তাঁর তিন ছেলে শেখ আজগর আলী সিকদার, শেখ আবদুর রহমান সিকদার ও শেখ আবদুস ছমদ সিকদার যৌথভাবে ১৯১৬ সালে মসজিদ পরিচালনার জন্য একটি ওয়াক্‌ফ ট্রাস্ট গঠন করেন। ১৯৫২ সালে শেখ আবদুস ছমদ সিকদারের একমাত্র ছেলে শেখ আবদুল আজিজ চৌধুরী মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। সে হিসাবে বর্তমান মসজিদটি ১৯৫২ সালে নির্মিত।

কালারমার মসজিদ বাংলার লোকজ স্থাপত্যে নির্মিত। মোটা দেয়াল ও প্রশস্ত ছাদ মসজিদটিকে ঝড়–বৃষ্টি সহনশীল করেছে। ছাদের কিনার বরাবর ছোট চূড়াসদৃশ অলংকরণ ঔপনিবেশিক যুগের ইঙ্গিত দেয়। খিলানাকৃতির জানালা ও জালি নকশার ভেন্টিলেশন স্থানীয় কারিগরদের ঐতিহ্য বহন করে। এককথায় এই মসজিদ কুতুবদিয়ার ধর্মীয় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য।

উত্তর ধুরুং ইউপির চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন আল আজাদ বলেন, তাঁর ইউনিয়নে ৩৩টির বেশি জামে মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে কালারমার মসজিদ সবচেয়ে প্রাচীন। এটি কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

কয়েক শ বছর আগে বাঁশের বেড়া ও গোলপাতার ছাউনি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এরপর ১৮৭৬ সালের দিকে মসজিদটিকে সেমিপাকা টিনের ছাউনিতে উন্নীত করেন এলাকার জমিদার শেখ মুহাম্মদ মনু সিকদার। পরে তাঁর তিন ছেলে শেখ আজগর আলী সিকদার, শেখ আবদুর রহমান সিকদার ও শেখ আবদুস ছমদ সিকদার যৌথভাবে ১৯১৬ সালে মসজিদ পরিচালনার জন্য একটি ওয়াক্‌ফ ট্রাস্ট গঠন করেন। ১৯৫২ সালে শেখ আবদুস ছমদ সিকদারের একমাত্র ছেলে শেখ আবদুল আজিজ চৌধুরী মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। সে হিসাবে বর্তমান মসজিদটি ১৯৫২ সালে নির্মিত।

ধুরুংবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুল আলম সিকদার বলেন, প্রাচীন এই মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের পৃথক ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীরা মানত করে এই মসজিদে হাজির হন এবং নামাজ আদায় করেন।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা জেটিঘাট দিয়ে পাঁচ কিলোমিটারের সাগর চ্যানেল পাড়ি দিয়ে দ্রুতগতির স্পিডবোটে কুতুবদিয়ার দরবারঘাটে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। সেখান থেকে উত্তর দিকে ১১ কিলোমিটার গেলে সামনে পড়ে কালারমার মসজিদ। উপজেলার লেমশীখালী, আলী আকবরডেইল, কৈয়ারবিল, বড়ঘোপ, উত্তর ধুরুং ও দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নে শতাধিক মসজিদ চোখে পড়ে। কিন্তু প্রাচীন মসজিদ হিসেবে কালারমার মসজিদকেই গুরুত্ব দেন দ্বীপের মানুষ। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে লেখা সুরা ইয়াসিন মুসল্লিদের নজর কাড়ে।

মসজিদের সামনে বড় একটি পুকুর। কুতুবদিয়ার সর্বত্র পানির সংকট চললেও এই পুকুরের পানি শুকিয়ে যায় না। মুসল্লিদের মধ্যে প্রচার রয়েছে, বিপদে পড়লে মানুষ এই মসজিদে ছুটে আসেন।

উত্তর ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির পরিচালক আ স ম শাহরিয়ার চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক কালারমার মসজিদ কুতুবদিয়ার ঐতিহ্য তুলে ধরছে। সংস্কার করে মসজিদের আয়তন আরও বাড়ানো হয়েছে। এখন জুমার নামাজে এক হাজারের বেশি মুসল্লি অংশ নিতে পারেন।

মসজিদের খতিব মাওলানা আবু মুছা বলেন, কুতুবদিয়া ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়সহ বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়ে বহুবার লন্ডভন্ড হয়েছে কুতুবদিয়ায়। কিন্তু কালারমার মসজিদের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। এ কারণে মসজিদ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।