সেনাসদস্য তিতাস শেখ নিহত হওয়ার পর থেকেই আহাজারি করে চলেছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। শুক্রবার দুপুরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে
সেনাসদস্য তিতাস শেখ নিহত হওয়ার পর থেকেই আহাজারি করে চলেছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। শুক্রবার দুপুরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’—নিহত সেনাসদস্যের স্ত্রীর আহাজারি

চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে (২২) বিয়ে করেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। কথা ছিল আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে কর্মস্থলে নিয়ে যাবেন। কিন্তু এর আগেই সন্ত্রাসীদের বুলেট থামিয়ে দিয়েছে তাঁর পথ চলা।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে তিতাস শেখের মরদেহ পৌঁছালে মা–বাবা, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।

কক্সবাজারে সন্ত্রাসী অভিযানে স্বামীর নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই বিলাপ করে চলেছেন তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন তিতাস শেখ। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। সেনাসদস্য তিতাসের বাবা আফজাল শেখ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকাশ হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৭) বাঁ কাঁধে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

সেনাসদস্য তিতাস শেখের মরদেহ বহনকারী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারটি শুক্রবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দা মাহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে অবতরণ করে। সেখানে পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ আরই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল মরদেহটি গ্রহণ করে। বিকেল ৫টার দিকে গাড়িতে করে মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হয় লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। সেখানে বাদ মাগরিব নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখ

এখানে পরিবারের পক্ষ থেকে নিহতের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার, নগরকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসানসহ এলাকার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তব্য দেন।

জানাজা শেষে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে তিতাসের মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হয় লস্করদিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে। এ সময় স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করেন। মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ ও স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে গ্রামের স্থানীয় কবরস্থানে নানির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

শোকে পাগলপ্রায় তিতাসের মা রেখা বেগম। তিনি জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তাঁর। তিতাস তখন বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’

সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের কবরে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে

তিতাসের এই কথাই যে শেষ কথা হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি মা রেখা বেগম। সন্তানের নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে শুধুই বিলাপ করে যাচ্ছেন। ছেলেকে হারিয়ে বাবা আফজাল শেখের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। বাক্‌রুদ্ধ হয়ে শুধুই ঝরছে চোখের পানি।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় আনা হয়। পরে স্থানীয় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লস্করদিয়াস্থ স্থানীয় কবরস্থানে নানির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

দাফনের পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে সমাধিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর সাতজন সৈনিক তিন দফায় ২১টি গুলি ছুড়ে সেনাসদস্যকে শেষবিদায় জানান।