
পাবনার বেড়া পৌরসভা এলাকার বৃশালিখা মহল্লার গরু ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন কোরবানির হাট সামনে রেখে ধারদেনা ও বাকিতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ৩৩টি গরু কিনেছিলেন। ঈদের কয়েক দিন আগে গরুগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকার ফতুল্লা, শারুল্লা ও মেঘনা পশুর হাটে।
উজ্জ্বল হোসেনের আশা ছিল, ভালো লাভ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২৬টি গরু বিক্রি করতে হয়েছে প্রায় আট লাখ টাকা লোকসান দিয়ে। আর সাতটি গরু বিক্রিই করতে পারেননি। ঈদ শেষ হওয়ার পর সেগুলো ফিরিয়ে এনেছেন বাড়িতে। ঢাকার হাটে যাওয়া-আসার ধকল সহ্য করতে না পেরে ফিরিয়ে আনা গরুগুলো ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘গরু কেনার টাকা জোগাড় করতি ধারদেনা আর বাকির ওপর নির্ভর করতে হইছে। ঢাকার হাটে গিয়া যা অবস্থা হইছে, তা কল্পনাও করি নাই। সাতটা গরু ফিরায়া আনছি, এখন এগুলা স্থানীয় হাটে বেচলে আরও লোকসান হবি। শ্রমিক, খাওয়াদাওয়া, যাতায়াতসহ সব হিসাব কইরা দেখছি, আমার প্রায় ১১ লাখ টাকা লস হবি। ধারদেনার টাকা কীভাবে শোধ করব, সেই চিন্তায় অস্থির হয়া আছি।’
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ভালো লাভের আশায় পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার পাঁচ শতাধিক খামারি ও ব্যবসায়ী গরু নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পশুর হাটে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই এবার লাভ তো দূরের কথা, ব্যাপক লোকসানে গরু বিক্রি করেছেন। অনেকে আবার সব গরু বিক্রি করতে না পেরে গরু ফিরিয়ে এনেছেন। ফলে ঈদের পর এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। কারও মাথায় ঋণের চাপ, কেউ পাওনাদারের তাগাদায় দিশাহারা, আবার কেউ ফিরিয়ে আনা গরুর খাবার ও চিকিৎসার খরচ জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
দেশের অন্যতম গবাদিপশু উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলা। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবার দুটি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত ছিল। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিপুলসংখ্যক পশু দেশের বিভিন্ন এলাকার হাটে পাঠানো হয়। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন পশুর হাটে বেড়া-সাঁথিয়া থেকে হাজার হাজার গরু নেওয়া হয়েছিল।
বেড়া পৌর এলাকার আরেক খামারি ও গরুর ব্যবসায়ী আরমান আকরাম বলেন, ‘১৯টা গরু নিয়্যা ঢাকার হাটে গেছিলাম। এর মধ্যে মাত্র ৯টা বিক্রি করতে পারছি। বাকি ১০টা ফিরায়া আনছি। এখন স্থানীয় হাট আর মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির চেষ্টা করতেছি। ইতিমধ্যে আমার ৮-১০ লাখ টাকা লোকসান হইছে।’
গরুর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগের কয়েক দিন পর্যন্ত তাঁরা আশা করেছিলেন, শেষ মুহূর্তে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। অনেকেই বেশি দামের আশায় শেষ দিন পর্যন্ত হাটে অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু ক্রেতা তুলনামূলক কম থাকায় অনেক হাটেই প্রত্যাশিত বেচাকেনা হয়নি। ফলে শেষ দিকে অনেক ব্যবসায়ী লোকসান মেনেই গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন। তারপরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গরু অবিক্রীত থেকে যায়।
বেড়া ও সাঁথিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকার হাট থেকে ফিরিয়ে আনা গরুর সংখ্যা কম নয়। সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব না পাওয়া গেলেও ব্যাপারী ও খামারিদের মতে, দুটি উপজেলার পাঁচ হাজারের বেশি অবিক্রীত গরু ঢাকা থেকে ফিরে এসেছে। এসব গরু ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েকটি গরুর খাবারে অনীহাও দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া, হাটে কয়েক দিন অবস্থান এবং পরিবহনে বারবার ওঠানামার কারণে গরুগুলো ধকল সহ্য করতে পারেনি।
সাঁথিয়ার সোনাতলা গ্রামের গরুর এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘১০টা গরুর মধ্যে ৮টাই ফিরায়া আনছি, সব গরু বাকিতে আর ঋণ কইরা কিনছিলাম। এখন পাওনাদারের ভয়ে বাড়ির থ্যা পালায়া আছি। ওদিকে আবার ফিরায়া আনা গরু নিয়্যাও আরেক বিপদ। সেগুলোর আবার খাবার লাগে, চিকিৎসা লাগে। সেই টাকাই–বা পাই কোনথ্যা।’
সাঁথিয়ার বড়াট গ্রামের খামারি আবদুল হাকিম বলেন, বাড়িতে গরুর ব্যাপারী এসে তাঁর দুটি ষাঁড়ের দাম সাড়ে তিন লাখ টাকা বলেছিলেন। কিন্তু আরও বেশি দামের আশায় এলাকার পাঁচজন খামারির সঙ্গে ট্রাক ভাড়া করে গরু নিয়ে ঢাকার পশুর হাটে যান তিনি। সেখানে প্রথম দিন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাম উঠলেও পরে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকাতেও ক্রেতা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত গরু দুটি বিক্রি না করেই ফিরিয়ে আনতে হয়েছে তাঁকে।
বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই ঢাকার হাট থেকে কিছু ব্যবসায়ী অবিক্রীত গরু ফিরিয়ে আনেন। তবে এবার সেই সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে শুনেছেন। ফিরিয়ে আনা গরুগুলো বেশ ঝুঁকির মধ্যে থাকে। দীর্ঘপথ পরিবহন, হাটে কয়েক দিন অবস্থান এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে অনেক গরুই খুরারোগ, মুখে ঘা কিংবা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই এসব গরুর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।