ভবদহ অঞ্চলে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী

জুলাই মাসের অব্যাহত বৃষ্টিতে ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ১০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়।

সাজানো–গোছানো ঘর ও গেরস্তালি ছিল সুমিত্রা মণ্ডলের। সব এখন পানির নিচে। বাড়ির উঠানে পানি। শোবার ঘরে পানি। পরিবারের সদস্য ও গরু নিয়ে তিনি উঠেছেন বাড়ির পাশের উঁচু সড়কে। সড়কের এক পাশে টিনের ছাপরা তুলে সেখানে বসবাস করছেন।

৫২ বছর বয়সী এই নারীর বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামে। সুমিত্রা মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘরের মধ্যে এক হাত জল উঠেছিল। এখন কমে এক বিঘত (বুড়ো আঙুলের ডগা থেকে কানি আঙুল পর্যন্ত) দাঁড়িয়েছে। উঠানে হাঁটুজল। তিন মাস ধরে রাস্তার ওপর আছি। একটা গরু আছে। এক পাশে গরু, অন্য পাশে আমরা থাকছি। স্বামী দুইবার স্ট্রোক করে খুবই অসুস্থ। আয়রোজগার তেমন নেই। খুব কষ্টে আছি।’

গত জুলাই মাসের অব্যাহত বৃষ্টিতে ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার অন্তত ১০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বৃষ্টির পানিতে এসব গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িঘর, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পানি ঢোকে। সুমিত্রা মণ্ডলের মতো তিন মাস ধরে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী জীবনযাপন করছেন। কেউ কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু সড়কে। সুজাতপুর গ্রামের মহানন্দ মণ্ডল বলেন, ‘উঠানে দেড় হাত আর ঘরের মধ্যে এক বিঘত জল। ঘরে থাকতে না পেরে রাস্তায় উঠেছি।’

অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার নিম্নাঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এই ভবদহ অঞ্চল। অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইচগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়। পলি পড়ে এলাকার পানিনিষ্কাশনের মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো উপচে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে।

ভুক্তভোগী স্থানীয় নারী দিপালী মণ্ডল বলেন, তিনি ঘরবাড়ি উঁচু করতে পারেননি। প্রায় সারা বছর তাঁর বাড়িতে পানি থাকে। থাকা ও চলাফেরায় খুব কষ্ট করতে হয়। তিন মাস আগের ভারী বৃষ্টিতে অভয়নগরের বলারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা, আন্ধা, দিঘলিয়া, বারান্দী, কোটা, ডহর মশিয়াহাটী, রাজাপুর, সুন্দলী, ভাটবিলা, সড়াডাঙা, হরিশপুর, ফুলেরগাতী এবং মনিরামপুরের হাটগাছা, সুজাতপুর, কুলটিয়া, লখাইডাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙা, পদ্মনাথপুর, পাড়িয়ালী, দহাকুলা, কুচলিয়া, নেবুগাতী, পাঁচকাটিয়া, ভুলবাড়িয়া, কুমারসীমা, কপালিয়া, পাচাকড়িসহ কয়েকটি গ্রামের বিভিন্ন  বাড়িতে পানি ওঠে। পরে ভবদহ স্লুইচগেটের ২১-ভেন্ট (কপাট) খুলে দিলে এবং ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত হরি ও তেলিগাতী নদী খনন করলে পানি নামতে শুরু করে। তবে বেশির ভাগ বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পানি আছে।

ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলমান। এবার ভবদহ বিলের পানি বেড়ে ছিল তিন ফুটের মতো। ২১-ভেন্ট ভবদহ স্লুইচগেটের সব কটি কপাট খোলা রয়েছে। কপাট দিয়ে পানি বের হচ্ছে। খুব দ্রুত এই পানি নেমে যাবে।
পলাশ কুমার ব্যানার্জী, পাউবোর যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী

গত শনিবার ভবদহ অঞ্চলের পাঁচটি গ্রাম ঘুরে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে। কিছু পরিবার গরু-বাছুর ও হাঁস-মুরগি নিয়ে উঁচু সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ আবার বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। আলাপকালে তিনজন বাসিন্দা বলেন, বর্তমানে পানি কিছুটা কমেছে। এক দিন বৃষ্টি হলে পানি বেড়ে যাচ্ছে। পানি থাকায় ঘরের মধ্যে মাচা করে সেখানে তাঁরা থাকছেন।

অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের নিরাপদ বিশ্বাস বলেন, গ্রামের দেড় শ বাড়ির সব বাড়িতে কমবেশি পানি। তাঁর বাড়ির উঠানে পানি ছিল। অনেকটা নেমে গেছে।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) আওতায় সেনাবাহিনী ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ করছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইচগেট থেকে ডুমুরিয়ার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, উপজেলার কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদী ৫ কিলোমিটার, মনিরামপুরের বাকোশপোল থেকে কেশবপুরের বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদ ৩৫ কিলোমিটার, কেশবপুরের বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদী ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগরের গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইচগেট পর্যন্ত টেকা নদী ৭ কিলোমিটার এবং মনিরামপুরের লেহালপুর বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটার শ্রী নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে।

সমস্যা সমাধানে এখনই টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-জোয়ারাধার) চালু করতে হবে। তা না হলে নদী পুনঃখননের প্রায় ১৪০ কোটি টাকা পুরোটাই অপচয় হবে।
ইকবাল কবির জাহিদ, ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা

ইতিমধ্যে ৫৯ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে হরিহর নদের ৩৫ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং হরি নদীর ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর সঙ্গে যুক্ত ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। আগামী বছরের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।

পাউবোর যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী প্রথম আলোকে বলেন, ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলমান। এবার ভবদহ বিলের পানি বেড়ে ছিল তিন ফুটের মতো। ২১-ভেন্ট ভবদহ স্লুইচগেটের সব কটি কপাট খোলা রয়েছে। কপাট দিয়ে পানি বের হচ্ছে। খুব দ্রুত এই পানি নেমে যাবে।

ভবদহ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন উল্লেখ করে ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ প্রথম আলোকে ­বলেনসমস্যা সমাধানে এখনই টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-জোয়ারাধার) চালু করতে হবে। তা না হলে নদী পুনঃখননের প্রায় ১৪০ কোটি টাকা পুরোটাই অপচয় হবে।