
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় মেঘনা নদীর বিভিন্ন অংশে ব্যাপকভাবে জাটকা ও ইলিশ নিধন চলছে। এতে ইলিশ উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাটকা ও ইলিশ ধরা বন্ধ না হওয়ার নেপথ্যে আছে মহাজন ও আড়তদারদের দাদন ব্যবসা। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এ অবৈধ ব্যবসা করছেন তাঁরা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেঘনা নদীর চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকায় ও পদ্মা নদীতে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিপত্র জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পরিপত্রে জাটকা ও ইলিশ নিধন ছাড়া এগুলো বিক্রি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণও নিষিদ্ধ করা হয়।
আজ শুক্রবার সকালে মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুর, নাওভাঙা, জয়পুর, আমিরাবাদ, এখলাশপুর, ষাটনল, ছটাকী ও শিকিরচর এলাকায় দেখা যায়, নদীর মাঝখানে একাধিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। জাল ফেলে মাছ ধরছেন কয়েকজন জেলে। কয়েকটি এলাকায় নিষিদ্ধ জাল পাতা থাকলেও সেগুলো ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না।
জাল পেতে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পর সুবিধামতো সময়ে এসে জাল টেনে মাছ ধরে ট্রলারে দ্রুত কেটে পড়েন জেলেরা। অভিযানকারী দলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেশির ভাগ সময়েই তাঁরা গভীর রাতে বা ভোররাতে ইলিশ ও জাটকা নিধন করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা।
মেঘনার তীরবর্তী আমিরাবাদ এলাকার সোহেল আহম্মেদসহ মোহনপুর ও এখলাশপুর এলাকার আরও অন্তত পাঁচজন বলেন, ১ মার্চ থেকে মেঘনায় ব্যাপকভাবে জাটকা ও ইলিশ ধরা হচ্ছে। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের অভিযান সত্ত্বেও প্রতিদিন গভীর রাতে ও খুব ভোরে জেলেরা জাটকা ও ইলিশ ধরছেন। সেসব মাছ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক সময় অভিযানের খবরও তাঁদের কাছে আগেভাগে পৌঁছে যায়। এসব কারণে জাটকা ধরা বন্ধ হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাওভাঙা ও জয়পুর এলাকার দুই স্কুলশিক্ষক অভিযোগ করেন, জাটকা ও ইলিশ শিকারের নেপথ্যে মাছের আড়তদার ও মহাজনেরা। জাল ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা (ট্রলার) কেনার টাকা, ট্রলারের ডিজেল খরচ, খাওয়ার খরচসহ জেলেদের সব খরচ দিচ্ছেন তাঁরা। এগুলোর জোগান পেয়ে জেলেরা মেঘনায় ইলিশ ও জাটকা ধরছেন। বিনিময়ে জেলেরা পাচ্ছেন কিছু মাছ ও টাকা। জেলে, মহাজন ও প্রভাবশালীদের সম্মিলিত প্রযোজনায় চলছে এ জাটকা নিধনযজ্ঞ। জাটকা বা ইলিশ নিধন বন্ধ করতে হলে নেপথ্যের কারিগরদের অপতৎপরতা ও ব্যবসা বন্ধ করতে হবে।
জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বলেন, মহাজন বা আড়তদারদের ‘চাপে পড়েই’ মূলত জেলেরা নদীতে জাটকা বা ইলিশ ধরছেন। এ সময় নদীতে প্রচুর ইলিশ ও জাটকার বিচরণ থাকে। জাল ফেললেই অনেক মাছ পাওয়া যায়। গোপনে বিক্রি করে ভালো টাকাও আয় হয়। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
মৎস্য কর্মকর্তা দাবি করেন, মেঘনায় জাটকা রক্ষায় প্রতিদিন সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। গত রোববার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ১৪টি অভিযান হয়েছে। এতে ১০০ কেজি জাটকা, ১ লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও তিনটি নৌকা জব্দ করা হয়। ২২ জেলেকে আটক করে ছয়জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর উপজেলার নিবন্ধিত ৫ হাজার ১৫০ জেলের প্রত্যেককে মাসে ৪০ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেওয়া হচ্ছে।