পানিতে তলিয়ে আছে বিল কেদারিয়া। জলাবদ্ধতার কারণে বিলে বোরো ধান হয়নি। গত মঙ্গলবার যশোরের অভয়নগর উপজেলার বেদভিটা এলাকায়
পানিতে তলিয়ে আছে বিল কেদারিয়া। জলাবদ্ধতার কারণে বিলে বোরো ধান হয়নি। গত মঙ্গলবার যশোরের অভয়নগর উপজেলার বেদভিটা এলাকায়

ভবদহে জলাবদ্ধতা

এবারও ৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়নি

যশোরের অভয়নগর উপজেলার বেদভিটা গ্রামের কৃষক পরিমল বিশ্বাস (৫৪)। প্রতিবছর বর্ষাকালে বাড়িতে পানি ওঠে। গত বর্ষা মৌসুমেও তাঁর বাড়িতে হাঁটুসমান পানি উঠেছিল। প্রায় চার মাস পর বাড়ির পানি নেমে গেছে। তবে বাড়িসংলগ্ন বিল কেদারিয়া ভরে আছে পানিতে। ওই বিলে পরিমলের জমি আছে ছয় বিঘা (৫২ শতকে বিঘা)।

পরিমল বিশ্বাস বলেন, ‘জমিতে এখনো বুকসমান জল। বিল থেকে জল নামছে না। এবারও এক শতক জমিতেও বোরো চাষ করতে পারলাম না।’

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের বেশির ভাগ বিল ভরে আছে গত বর্ষার পানিতে। বিলের কোথাও কোমরসমান আবার কোথাও বুকসমান পানি। বিলের জমিতে পরিমল বিশ্বাসের মতো বেশির ভাগ কৃষক এবারও বোরো ধানের চাষ করতে পারেননি।

যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫২টি ছোট-বড় বিল আছে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠানামা করে। কিন্তু পলি পড়ায় নদীগুলো নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে এসব নদী দিয়ে এখন ঠিকমতো পানি নিষ্কাশন হয় না। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হয়। বিল উপচে পানি ঢোকে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলোয়। সর্বশেষ গত বছরের জুলাই ও আগস্ট অতিবর্ষণে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রামের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এবং মাছের ঘের পানিতে প্লাবিত হয়। পানিবন্দী হয়ে দুর্ভোগে পড়েন দুই লাখের বেশি মানুষ। এরপর ভবদহে শ্রী ও হরি নদ-নদীতে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে পাইলট (পরীক্ষামূলক) চ্যানেল কাটার কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। একপর্যায়ে বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যায়। কিন্তু এখনো এ অঞ্চলের বেশির ভাগ বিল পানিতে তলিয়ে রয়েছে।

পানিতে ভরে আছে বিল ঝিকরা। জলাবদ্ধতার কারণে বিলে বোরো ধান হয়নি। বুধবার বিকেলে যশোরের অভয়নগর উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকায়

কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুম। বোরোর বীজতলা তৈরির সময় ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। বোরো ধানের চারা রোপণের সময় ১ থেকে ৩১ জানুয়ারি। নাবিতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানের চারা রোপণ করা হয়।

অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা তিনটির ভবদহ অঞ্চলে কৃষক আছেন প্রায় ৫০ হাজার। ওই অঞ্চলে ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হতো। এর মধ্যে অভয়নগরে ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর, কেশবপুরে ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর এবং মনিরামপুরে ১২ হাজার ১০৪ হেক্টর জমি আছে। এবার তিন উপজেলায় মোট ১৭ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে এবার উপজেলা তিনটির ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি। এর মধ্যে অভয়নর উপজেলায় ১ হাজার ২৯০ হেক্টর, কেশবপুর উপজেলায় ২ হাজার ১৩০ হেক্টর এবং মনিরামপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমি রয়েছে।

সূত্র জানায়, গত বছর এ অঞ্চলে ১৬ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছিল। গত বছরের চেয়ে এবার ১ হাজার ৪ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হচ্ছে।

তবে বাস্তবে আরও বেশি জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে ধান চাষ করা যায়নি বলে অভিযোগ ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদের। তিনি বলেন, ‘কৃষি অফিস ভবদহ অঞ্চলের কৃষিজমি এবং জলাবদ্ধ কৃষিজমির যে তথ্য দিয়েছে, তা ঠিক নয়। এ তথ্য অগ্রহণযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে ভবদহ অঞ্চলের এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি জমিতে এবার বোরো চাষ হচ্ছে না।’

গত এক সপ্তাহে ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ১০টি বিল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিলগুলো ভরে আছে পানিতে। বিল বোকড়, বিল কেদারিয়া, বিল কপালিয়া, বিল ডুমুর, বিল ঝিকরা, বিল গান্ধীমারী, বিল গজালমারী ও বিল পায়রায় শুধু পানি আর পানি। কোনো কোনো বিলের ওপরের অংশ চারদিকে বাঁধ দিয়ে সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ বিলে কোনো ধানখেত নেই। বিলের পানিতে ভাসছে কিছু আগাছা, কচুরিপানা আর শাপলা।

মনিরামপুর উপজেলার নেবুগাতী গ্রামের কৃষক বিমল রায়ের (৬৮) বিল বোকড়ে জমি আছে ৯ বিঘা (৪২ শতকে বিঘা)। এর মধ্যে বিলের একটি মাছের ঘেরের মধ্যে তাঁর জমি আছে তিন বিঘা। সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে তিনি এর মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিল বোকড়ে মুক্তেশ্বরী নদীর এক পাশে আমার ৬ বিঘা জমি আছে। ওই জমিতে এখনো ৫ থেকে ৭ ফুট জল। সেখানে বোরো ধান চাষ সম্ভব না। নদীর অপর পাশে তিন বিঘা জমি আছে। জল অনেকটা কম থাকায় জল সেচে এর মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে বোরো ধান করেছি।’

বিল ডুমুরে ১৫ বিঘা (৫২ শতকে বিঘা) জমি আছে মনিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক অসীম ধরের (৬৪)। ওই জমিতে বুকসমান পানি রয়েছে। এবার সেচযন্ত্র দিয়ে পানি সেচে তিনি আট বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিলের ওপরের অংশে জল কম ছিল। সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে আট বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। নিচের জমিতে অনেক জল। সেচের মতো অবস্থা নেই। ওই জমিতে ধান লাগানো সম্ভব হয়নি।’

অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন বলেন, উপজেলার ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধ বিলের পানি সেচে বোরো চাষ করেছেন কৃষকেরা। জলাবদ্ধ এলাকায় গত বছরের চেয়ে এবার ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। মনিরামপুরেও এবার গত বছরের চেয়ে বেশি জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার।

কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন বলেন, ‘এলাকার কৃষকেরা ছোট বিলগুলো সেচে বোরো চাষের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু খননের জন্য নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ায় শেষ সময়ে এসে নদী দিয়ে বিলের পানি নামতে পারেনি। পানি নামতে পারলে আরও অনেক বেশি জমিতে বোরো চাষ করা সম্ভব হতো।’

ভবদহ এলাকার পানিনিষ্কাশনের জন্য নদী পুনঃখননের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী। তিনি বলেন, ‘নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে সেচে নদী শুকিয়ে পুনঃখননের কাজ করা হচ্ছে। এলাকার বিলগুলোয় বোরো আবাদের জন্য তিনবার পিছিয়ে গত ১ জানুয়ারি নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেটের ১২টি গেট খোলা ছিল। এ জন্য নদীতে বাঁধ দেওয়ার আগেই এলাকার বেশির ভাগ পানি দ্রুত নেমে গেছে। এ জন্য এলাকার বিলগুলোয় গত বছরের চেয়ে এবার বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।’