মাংস সমিতির উদ্যোগে গরু জবাই করে মাংস বন্টন চলছে। গতকাল শুক্রবার রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পীরগাছায়
মাংস সমিতির উদ্যোগে গরু জবাই করে মাংস বন্টন চলছে। গতকাল শুক্রবার রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পীরগাছায়

গ্রামে গ্রামে রোজার ঈদে কোরবানির আমেজ

এবার ঈদে ভ্যানচালক ফারুক হোসেনের বাড়িতে সাড়ে সাত কেজি মাংস। কয়েক বছর থেকে রোজার ঈদে তাঁর বাড়িতে এভাবেই গরু-খাসির মাংসের ব্যবস্থা হচ্ছে। সাধারণত কোরবানির ঈদে ধনী-গরিবনির্বিশেষে বাড়িতে বাড়িতে কমবেশি মাংসের ব্যবস্থা থাকে। রোজার ঈদে এটা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা মাংস সমিতি।

সমিতির সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেন। ঈদের দু-এক দিন আগে থেকে সমিতির গরু ও খাসি জবাইয়ের প্রস্তুতি চলে। জেলায় এ রকম অনেক সমিতি গড়ে উঠেছে। এতে বোঝার উপায় নেই যে কোরবানির ঈদের উৎসব হচ্ছে, নাকি রোজার ঈদের। বিশেষ করে হতদরিদ্র পরিবারের পক্ষে কোরবানি দেওয়া সম্ভব হয় না, কিন্তু সমিতি করে রোজার ঈদে তাঁরা ঠিকই মাংস খেতে পারছেন। নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত করছেন।

ফারুক হোসেনের বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নওটিকা গ্রামে। তাঁর স্ত্রীর নাম সাবিনা খাতুন। তিনি একটি সমিতির সভাপতি ছিলেন। এবার গরু ও খাসি মিলে মাংস পেয়েছেন সাড়ে সাত কেজি। ঈদের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, সেইটুকু রান্না করে বাকিটা প্রতিবেশীর রেফ্রিজারেটরে রেখে দেন। ফারুক হোসেন জানান, তিনি ভ্যান চালান। ভাড়ার আয় থেকে প্রতি সপ্তাহে ৫০ বা ১০০ টাকা দেওয়া তাঁর জন্য কিছু না। কিন্তু একসঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটা গরু কিংবা খাসি কোরবানি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এই সমিতি করেছেন।

সমিতির প্রত্যেক সদস্য প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা চাঁদা জমা করতেন। তাঁরা ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছিলেন। সমিতির সদস্যরা ৭ কেজি করে মাংস ভাগে পেয়েছেন। প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৭০৪ টাকা। বাজারে এই মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।
সাইফুল ইসলাম, রাজশাহীর গোদাগাড়ী শহরের মহিশাল বাড়ি মহল্লার ব্যবসায়ী

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজশাহীর বাঘা উপজেলাতেই এ রকম সমিতির ৬০০টি গরু জবাই হয়েছে। তবে খাসির কোনো পরিসংখ্যান নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, সমিতির মাধ্যমে প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়ছে ৬৬৫ থেকে ৬৭০ টাকা, যা বাজারদরের চেয়ে বেশ কম। তাঁর মতে, উপজেলায় প্রায় ২০০ গ্রামে এ ধরনের উদ্যোগে ৬০০টির বেশি গরু জবাই হয়েছে, যার বাজারমূল্য সাত কোটি টাকার বেশি।

উপজেলার পীরগাছা গ্রামের ৩৫ জনের একটি সমিতির গরুর মোট মাংস হয়েছে সাড়ে ছয় মণ। প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৬৭৭ টাকা। এই সমিতির সভাপতি স্কুলশিক্ষক লতা বেগম জানান, তাঁর সমিতির সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা করে চাঁদা দিয়েছেন। এই টাকা দিয়ে তাঁরা গরু কিনেছিলেন। প্রত্যেক সদস্যের ভাগে পড়েছে ৭ কেজি ৩০০ গ্রাম মাংস।

নওটিকা গ্রামের মৃদুল ইসলামের সমিতিতে ৩৫ জন সদস্য ছিলেন। তিনি জানান, সমিতির প্রত্যেক সদস্য প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা চাঁদা জমা করতেন। তাঁরা ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছিলেন। সমিতির সদস্যরা ৭ কেজি করে মাংস ভাগে পেয়েছেন। প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৭০৪ টাকা। বাজারে এই মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।

গোদাগাড়ী পৌর এলাকার মহিশাল বাড়ি মহল্লার ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, তাঁরা মাসে ৩০০ টাকা চাঁদার সমিতি করেছিলেন। মাংস পেয়েছেন ৫ কেজি করে। তাঁদের প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়েছে ৭২০ টাকা। তিনি বলেন, কসাইয়ের কাছ থেকে মাংস কিনতে গেলে সেই মাংসের মধ্যে হাড়-চর্বি দিয়ে ভরে দেয়। কিন্তু সমিতির মাংসের ভেতরে একটা গরুর সব জায়গার মাংস সমানভাবে মিশিয়ে ভাগ করা হয়। এতে খাওয়ার উপযোগী মাংসের পরিমাণ বেশি থাকে।

তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের কৃষক নাজমুল হক জানান, তাঁদের সমিতির প্রত্যেকে সপ্তাহে ৫০ টাকা চাঁদা দিতেন। মাংস পেয়েছেন ৩ কেজি করে। তিনি বলেন, সমিতি না করলে এই ঈদে তাঁর পক্ষে এক কেজি গরুর মাংস কিনার সামর্থ্য ছিল না।

জেলায় এই ঈদে কী পরিমাণ গরু-খাসি জবাই হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান আছে কি না জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তদারকি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, কোরবানির ঈদে এ বিষয়ে প্রস্তুতি থাকে তাঁদের, কিন্তু রোজার ঈদে যে এত পরিমাণ গরু-ছাগল জবাই হবে, এ তথ্য সংগ্রহের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তবে তিনি দেখেছেন, তাঁর গ্রামের বাড়ি চারঘাটের পাষান্ডিয়াতেই এবার চারটি সমিতির লোক গরু জবাই করেছে। এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কোরবানির ঈদের মতোই রোজার ঈদেও গরু-ছাগলের ব্যবসার একটা বিরাট বাজার তৈরি হয়েছে। তাঁরা ভাবছেন ভবিষ্যতে এই পরিসংখ্যানটা প্রস্তুত রাখবেন।

বাঘা উপজেলার দিঘা স্কুল ও কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ বলেন, একসময় বিভিন্ন ক্লাব ও সমিতি গঠন করে সমাজের মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি করার প্রচলন ছিল। এখন এই মাংস সমিতি করে সমাজের মধ্যে মানুষের সেই ভ্রাতৃত্ববোধ ও মেলবন্ধন গড়ে উঠছে। এটা একটা ইতিবাচক দিক বলে তাঁর মনে হচ্ছে।