চট্টগ্রামের রাউজানে অস্ত্রবাজি ও খুনের ঘটনা থামছে না। গত দেড় মাসের ব্যবধানে পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের ৫০০ মিটারের মধ্যেই প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে দুজনকে। দুটি ঘটনায় কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এলাকায় অস্ত্রবাজি ও খুনোখুনি অব্যাহত থাকায় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদকে (৫০)। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ছিলেন। মুখোশ পরা একদল অস্ত্রধারী যুবক মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়ে হামলাকারীরা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, আবদুল মজিদের চোখের ওপরে, বুকে ও কোমরে—মোট তিনটি স্থানে গুলি লেগেছে।
নিহত আবদুল মজিদের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীকে আগেও একবার মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল সন্ত্রাসীরা। সেবার বাঁচলেও এবার আর রক্ষা পাননি। আমি এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জেনেছি, পূর্ববিরোধের জেরে আবদুল মজিদকে গুলি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করুক।’
এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি-বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।
যে স্থানে মজিদকে হত্যা করা হয়েছে একই জায়গায় গত ৫ জানুয়ারি জানে আলম নামের এক যুবদল নেতাকে গুলি করে খুন করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ শ মিটার দূরে পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের অবস্থান। তদন্তকেন্দ্রের পাশেই পরপর দুটি হত্যার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্ব গুজরা এলাকার এক বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলে এসে কাউকে গুলি করে বীরদর্পে চলে যাচ্ছে। পুলিশ কাউকে ধরতেই পারছে না। অথচ কাছেই পুলিশ তদন্তকেন্দ্র। ধরব, ধরা হচ্ছে, বলেই পুলিশের কাজ শেষ। আমরা সাধারণ বাসিন্দারা কীভাবে নিরাপত্তাবোধ করব।’
২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাউজানে উপজেলার শ্রমিক দলের এক নেতাকে গুলি করে করে পালিয়ে যান সন্ত্রাসীরা। ঘটনাটি ঘটে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায়। গুলিবিদ্ধ মেহেদী হাসান (৩২) উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তাঁকে গুলি করার ঘটনায়ও কাউকে আটক করা যায়নি। মেহেদী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ জানায়, রাউজানে ১৮ মাস ধরেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে আসছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, কখনো ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে। হতাহত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি-বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলাকায় যেতে পারতেন না বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এলাকায় ফিরতে শুরু করেন তাঁরা। এরপর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিবাদ-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়েন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারীরা। বিভিন্ন সংঘর্ষ-হানাহানির ঘটনায় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে আসছে।
রাউজানে আর একটিও যাতে লাশ না পড়ে, সে বিষয়টি র্যাব-পুলিশসহ প্রশাসনের সবাইকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যে দল কিংবা ব্যক্তির সহযোগী হোক, তাদের যাতে গ্রেপ্তার করা হয়।গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান)।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাউজানে আর একটিও যাতে লাশ না পড়ে, সে বিষয়টি র্যাব-পুলিশসহ প্রশাসনের সবাইকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যে দল কিংবা ব্যক্তির সহযোগী হোক তাদের যাতে গ্রেপ্তার করা হয়।’
রাউজানে বারবার গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান ও অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে তাঁরা সাড়া না দেওয়ায় তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে পুলিশ বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করেছে। সম্প্রতি গুলি করে দুজনকে হত্যার ঘটনায়ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বাসিন্দাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।