একদিন দুপুরে থালায় ভাত বেড়ে ছেলেকে খেতে ডাকেন রুলি বেগম। ছোট্ট ছেলেটি থালার দিকে এগিয়ে এসে ভাতের ওপরই পা দিয়ে বসে। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, ছেলের চোখের সামান্য যে আলো ছিল, সেটিও নিভে গেছে। চিকিৎসকেরাও কোনো আশার কথা শোনাতে পারেননি। সেই মুহূর্তে রুলি বেগমের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল—দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই ছেলের ভবিষ্যৎ কী হবে, কীভাবে চলবে তাঁর জীবন।
কিন্তু কয়েক দশক পর সেই অনিশ্চয়তার উত্তর মিলেছে ভিন্নভাবে। এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের ৫২ বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুকলেস আলীই প্রতিদিন কাজ করে সংসারের আয়ের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন।
সম্প্রতি ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকালে রুলি বেগম ছেলের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন। মুকলেসের হাতে একটি বস্তা। দুপুরের খাবারের জন্য কাপড়ে বাঁধা রয়েছে কয়েকটি রুটি, সঙ্গে লবণ ও কাঁচা মরিচ। বাড়ি থেকে কিছুটা পথ এগিয়ে পাকা সড়কে তুলে দিয়ে মা ফিরে যান। এরপর প্রায় দুই কিলোমিটার পথ একাই হেঁটে কাঠচেরাই কারখানায় পৌঁছান মুকলেস।
কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, মালিক এ টি এম হাসানুজ্জামান তাঁকে একটি কাঠের গুঁড়ির পাশে বসিয়ে দেন। মুকলেস আধখানা একটি ইট হাতে নিয়ে গুঁড়িতে আঘাত করতে থাকেন। ধীরে ধীরে কাঠের বাকল আলাদা হয়ে আসে। কাজ শেষে সেই বাকল বস্তায় ভরে মাথায় করে বাড়ি নিয়ে যান। বাকিটা কারখানার মালিক রিকশাভ্যানে পাঠিয়ে দেন।
বাড়িতে সেই বাকল রোদে শুকিয়ে খড়ি হিসেবে বিক্রি করেন মা রুলি বেগম। এতে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এ ছাড়া রুলি বেগম বিধবা ভাতা পান, আর মুকলেস পান প্রতিবন্ধী ভাতা। এই কয়েকটি আয়ের উৎস মিলিয়েই চলে মা-ছেলের সংসার।
মা রুলি বেগম, ছোট ভাই সোহেল রানা, প্রতিবেশী, কারখানার মালিক ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুকলেস জন্মান্ধ ছিলেন না। ছোটবেলায় অল্পস্বল্প দেখতে পেতেন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও তিনি কখনো ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেননি। ছোটবেলা থেকেই কাঠের কারখানায় পড়ে থাকা খড়ি কুড়িয়ে এনে সংসারে কিছুটা সহায়তা করতেন।
২০১০ সালে বাবা ইটভাটা শ্রমিক মোরশেদ আলী মারা যান। তারও প্রায় এক দশক আগে মাটি কাটার সময় দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। এরপর তিনি আর নিয়মিত কাজ করতে পারতেন না। তখন থেকেই সংসারের বড় দায়িত্ব এসে পড়ে মুকলেসের ওপর।
মুকলেসের ছোট ভাই সোহেল রানা স্থানীয় একটি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। মাসে ৯ হাজার টাকা বেতন পান। তাঁর চার সন্তান রয়েছে।
সোহেল রানা বলেন, ‘আমার নিজের সংসারই ঠিকমতো চলে না। তাই মায়ের দায়িত্ব নিতে পারিনি। বড় ভাই মায়ের দেখাশোনা করছে।’
কারখানার মালিক এ টি এম হাসানুজ্জামান বলেন, মুকলেস তাঁর প্রতিবেশী এবং প্রায় সমবয়সী। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে কাজ করতে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমি একদিন ওকে বলেছিলাম, মানুষের কাছে হাত পাতলে অনেক বেশি টাকা পাবি। তখন ও বলেছিল, “আমি মরে গেলেও মানুষের কাছে হাত পাততে পারব না। কাজ করে আধপেটা খেলেও সেটাই আমার সম্মান।’”
ঝড়-বৃষ্টি যা–ই হোক, প্রতিদিনই মুকলেস কাঠচেরাইয়ের কারখানায় আসেন। কাজ না থাকলেও কারখানায় বসে সময় কাটান।
প্রতিবেশী মাদ্রাসাশিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, মুকলেসের আত্মসম্মানবোধ প্রবল। তিনি কখনো কারও কাছে সাহায্য চান না। তিনি বলেন, ‘এখন অনেক সুস্থ-সবল মানুষও বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নেন না। সেখানে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে মায়ের দেখাশোনা করছেন। এ জন্য এলাকার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করেন।
ভোলাহাটের গোহালবাড়ি গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান প্রায় ৩০ বছর ধরে একই কারখানায় ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যত দিন ধরে এখানে আছি, তত দিন ধরেই মুকলেসকে কাজ করতে দেখছি। দুপুরে বাড়ি থেকে আনা রুটি, লবণ আর মরিচ খেয়েই দিন কাটায়। বয়স বাড়ছে। ভবিষ্যতে কী হবে, সেটাই চিন্তার বিষয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তাঁর জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করতে পারত, তাহলে ভালো হতো।’
ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হোসেন বলেন, তিনি মুকলেসের বিষয়ে জেনেছেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেন। কিন্তু মুকলেস আত্মমর্যাদা বজায় রেখে কাজ করে জীবন যাপন করছেন এবং বৃদ্ধ মায়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। মা ও ছেলে যেসব সরকারি সহায়তার যোগ্য, সেগুলো দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি তাঁদের ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ার খবর পেয়ে এক বান্ডিল ঢেউটিন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও সুযোগ এলে সহায়তা দেওয়া হবে।’
কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় কথা হয় মুকলেস আলীর সঙ্গে। তাঁর একটাই আক্ষেপ, অর্থাভাবে কখনো চোখের চিকিৎসা করাতে পারেননি।
‘টাকার অভাবে কুনুদিন চোখের চিকিৎসা করাইতে পারিনি। কেহু যুদি আমার চোখের চিকিৎসাটা করাইতোক। চোখ যুদি দেখতে পাইতুং, তেবে মাকে দেখতুং। হামি আর কিছু চাহি না,’ বলছিলেন মুকলেস।