খুলনার পাইকগাছার কপিলমুনি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা বার্লির খেত। প্রথমবারেরই বার্লি চাষে দেখা দিয়েছে আশাব্যঞ্জক ফলন। গত বুধবার তোলা
খুলনার পাইকগাছার কপিলমুনি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা বার্লির খেত। প্রথমবারেরই বার্লি চাষে দেখা দিয়েছে আশাব্যঞ্জক ফলন। গত বুধবার তোলা

লবণাক্ত জমিতে পরীক্ষামূলক বার্লি চাষ, উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা

গ্রামের কৃষকেরা আগে কখনো ভাবেননি, লবণাক্ত এ জমিতে সম্ভব হতে পারে বার্লির চাষ। সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন কৃষক মনিরুল ইসলাম। রবি মৌসুমে নিজের এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বার্লি চাষ করে তিনি সফলতা পেয়েছেন।

মনিরুল ইসলামের বাড়ি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি এলাকায়। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে নানা ফসলের সমাহার। এক পাশে শর্ষে, অন্য পাশে গম, কোথাও পাট চাষের প্রস্তুতি। এর মাঝখানে সবুজ বার্লির খেত আলাদা করে নজর কাড়ছে। খেতের প্রান্তে টাঙানো আছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা কৃষকের নাম এবং বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি-১০—দুটি জাতের নাম।

কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জমিতে আগে গম চাষ করতাম। এবার কৃষি গবেষণা বিভাগের পরামর্শে প্রথমবার বার্লি চাষ করিছি। তারা আমারে বিনা মূল্যে বীজ, সার সবকিছু দিছে। শুরুতে ফলন হয় কি না একটু চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এখন ফলন দেইখে ভালো লাগদিছে। আশপাশের কৃষকেরাও দেখতি আসে আমার খেত। অনেকে বার্লির বীজও রাখতি বলিছে।’

বারির সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, পাইকগাছা উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসান বলেন, এই এলাকায় এটিই প্রথম পরীক্ষামূলক বার্লি আবাদ। বারি বার্লি-৭ খাটো এবং ৯০-১০৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। আর বারি বার্লি-১০–এর উচ্চতা ৯০ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার। এটি লবণাক্ত জমিতেও হেক্টরপ্রতি গড়ে ২ থেকে ২ দশমিক ৪ টন ফলন দেয় এবং ৮০ থেকে ৮৬ দিনের মধ্যে পাকতে শুরু করে। পাইকগাছার জন্য বারি বার্লি-১০ তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী বলে মনে হয়েছে তাঁর।

জাহিদ হাসান আরও বলেন, অনুর্বর ও লবণাক্ত জমিতে স্বল্প খরচে বার্লি চাষ সম্ভব। পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম এবং সেচ ছাড়াও ফলনে বড় তারতম্য দেখা যায় না। রবি মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে যেখানে অন্য ফসল ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে বার্লি হতে পারে সম্ভাবনাময় বিকল্প। পরীক্ষামূলক আবাদ সফল হওয়ায় আগামী মৌসুমে চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে বলে তিনি জানান।

মনিরুল ইসলামের পাশের জমির মালিক আমিরুল ইসলাম। বার্লির খেতের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতে যখন শুনলাম মনিরুল ভাই বার্লি লাগাচ্ছেন, তখন মনে হইছিল—এ আবার কেমন ফসল! ভাবতাম, বার্লি তো বিদেশে হয়, আমাগের দেশে হয় না। কিন্তু এখন দেখতিছি গাছের বৃদ্ধি ভালো, শীষও সুন্দর হইছে। ভাবতিছি আগামী মৌসুমে আমিও কিছুটা জমিতে বার্লি চাষ করে দেখব।’

বারির গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পাইকগাছার পার্শ্ববর্তী কয়রা উপজেলার লবণাক্ত এলাকায় গত ছয় বছর ধরে বার্লি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা বীজ দিয়ে প্রায় ১৫০টি নতুন লাইন উদ্ভাবন করা হয়েছে। সেগুলো বড় প্লটে পরীক্ষামূলকভাবে চাষের প্রস্তুতি চলছে। সফল হলে দ্রুত কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বার্লি উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলে তাঁর আশা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে কৃষকদের প্রচলিত চাষাবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিকল্প তৈরি করা জরুরি। দেশে বার্লির চাহিদা থাকলেও উৎপাদন কম হওয়ায় আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বার্লিভিত্তিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এ ফসল খাদ্য ও পশুখাদ্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।