ধর্ষণ
ধর্ষণ

শিশুশিক্ষার্থীকে তিন মাস ধরে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসাশিক্ষক কারাগারে

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মাদ্রাসার এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় করা মামলায় ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তারের পর আজ শুক্রবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার শিক্ষক মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি ওই মাদ্রাসায় তিন বছর ধরে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। মাদ্রাসাটির মুহতামিমকে (পরিচালক) হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি উপজেলা সদরের কওমি মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।

শিশুটির পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক ওই মাদ্রাসায় প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী রয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগে ভর্তি হয় ভুক্তভোগী ছেলেশিশুটি। প্রায় তিন মাস আগে অভিযুক্ত শিক্ষক শিশুটিকে মাদ্রাসার একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন। ঘটনাটি কাউকে জানালে শিশুটিকে মেরে ফেলার ভয় দেখান। এর এক দিন পর তিনি শিশুটিকে আবার ধর্ষণ করেন। এভাবে প্রায় এক মাস চলতে থাকে। এর মধ্যে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে শিক্ষকের ভয়ে আসল ঘটনা পরিবারকে বলেনি সে। মাকে শিশুটি পেটব্যথার কথা জানায়।

মাদ্রাসার শিক্ষক যে এ ধরনের অপকর্ম করতে পারেন, তা খুবই ভয়ংকর। এ ধরনের জঘন্য অপরাধ যে শিক্ষক করেছেন, তাঁর উপযুক্ত বিচার হওয়া প্রয়োজন।
আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, সংসদ সদস্য, টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর)

শিশুটির মা তাকে বাড়িতে নিয়ে প্রথমে মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে কুমুদিনী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুটি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে মা তাকে মাদ্রাসায় রেখে যান। এরপর আবারও মাদ্রাসায় একই ঘটনা ঘটলে শিশুটির মা তাকে স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানের লোকজনের পরামর্শে ওষুধ খাওয়ান। ছেলেকে আবারও মাদ্রাসায় রেখে যান।

সবশেষ এক সপ্তাহ আগে মাকে ফোন করে মাদ্রাসা থেকে ওই শিশুকে নিয়ে যেতে বলা হয়। শিশুটির মা বলেন, ‘আমি গত মঙ্গলবার মাদ্রাসা আসছি পরে বাচ্চাটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে আর বলে, “আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও”। আমি ছেলের জন্য রান্না করে নিয়ে আসলে খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়। সেদিন সেই খাবারও হাতে নেয় না। আমাকে খালি বলে, “আমাকে নিয়ে চল, আমি এখানে থাকুম না। আমার অনেক কষ্ট হয়”। আমি তখনো বুঝতে পারিনি। পেটব্যথার কথা বললে আমি তাকে সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

এ ঘটনায় শিশুটির মা আজ দুপুরে বাদী হয়ে মির্জাপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদ্রাসার মুহতামিম পুলিশের হেফাজতে আছেন।
আবদুল্লাহ আল মামুন, ওসি, মির্জাপুর থানা

পরে ছেলেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান ওই মা। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন শিশুটির মা।

চিকিৎসকের বরাত দিয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “আপনার ছেলেকে যে এ রকম (ধর্ষণ) করছে, কোনো সময়ই কিছু মনে হয় নাই?” আমি বলি, না। মুরব্বিরা বলে, রক্ত আমাশয় হয়, সে জন্য কিছু মনে করি নাই। লাস্টে (শেষে) আমার ছেলেরে এক্স-রে করাইছে, পরীক্ষা করাইছে। তারপর কালকে আমাকে এই (ধর্ষণের) রিপোর্ট দিছে, আর বলছে, “আপনার ছেলেকে ওই মাদ্রাসা থেকে সরান, না হলে বাঁচাতে পারবেন না।”’

আজ সকালে বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে এবং মুহতামিমকে জানাতে মাদ্রাসায় যান শিশুটির মা ও নানা। অধ্যক্ষকে বিষয়টি জানালে তিনি তাঁদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এ সময় পাশে থাকা অভিভাবকেরাও বিষয়টি জানতে পারেন। এ সময় অভিযুক্ত শিক্ষক এগিয়ে এসে পাশে থাকা কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে তর্কে জড়ান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাজিম উদ্দিন ও স্থানীয় আবু সালেহ মোহাম্মদ সেলিম। তাঁদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় মুহতামিম অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসার ফটক আটকে দিতে বলেন। মুহতামিম অভিভাবকদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার চেষ্টা করেন। অন্যান্য অভিভাবক ও স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক ও মুহতামিমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

মুহতামিম জানান, অভিযুক্ত শিক্ষককে মাদ্রাসার শিক্ষকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হবে। তবে তিনি অভিভাবকদের ওপর হামলাচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় শিশুটির মা আজ দুপুরে বাদী হয়ে মির্জাপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদ্রাসার মুহতামিম পুলিশের হেফাজতে আছেন। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত তিনি থানাতেই ছিলেন।

এ ঘটনায় জড়িত শিক্ষকের বিচার দাবি করেছেন টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। আজ দুপুরে তিনি মির্জাপুরের একটি মাদ্রাসার নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষক যে এ ধরনের অপকর্ম করতে পারেন, তা খুবই ভয়ংকর। এ ধরনের জঘন্য অপরাধ যে শিক্ষক করেছেন, তাঁর উপযুক্ত বিচার হওয়া প্রয়োজন।