জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তির টাকা বাড়েনি ৮ বছর, পেতেও দেরি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে প্রতি বর্ষের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি বিভাগের অর্ধেক শিক্ষার্থীকে সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। এই বৃত্তির পরিমাণ মাসে ৫০০ টাকা। ২০১৮ সালের পর গত আট বছরে এই অর্থের পরিমাণ বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির বর্তমান বাস্তবতায় এই বৃত্তি এখন আর প্রকৃত অর্থে আর্থিক সহায়তা নয়; বরং প্রতীকী প্রণোদনায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া নিয়মিত সময়ে বৃত্তির অর্থ হাতে না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালটিয়ে সরকারি ও ট্রাস্টভিত্তিক আরও অন্তত ২০টি বৃত্তি এবং ৩টি স্বর্ণপদক চালু রয়েছে। তবে এসব বৃত্তির বড় অংশই একই ধরনের মেধার মানদণ্ডে দেওয়া হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী একই ফলাফলের ভিত্তিতে একাধিক ট্রাস্ট বৃত্তি বা স্বর্ণপদক পাওয়ার সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক পাঠদান কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছর পর সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তি চালু হয়। ১৯৮০-এর দশকে এর পরিমাণ ছিল মাসে ৭৫ টাকা। পরে তা ১০০ ও ১২৫ টাকায় উন্নীত করা হয়। দীর্ঘদিন একই হার বহাল থাকার পর ২০১৮ সালে বৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে মাসে ৫০০ টাকা করা হয়। সে হিসাবে একজন শিক্ষার্থী চার বছরের স্নাতক জীবনে প্রতিবার বৃত্তি পেলে মোট ২৪ হাজার টাকা পান।

আমরা ইতিমধ্যে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। কিন্তু অনার্সের চতুর্থ বর্ষের বৃত্তির টাকা এখনো পাইনি।
জাহিদ হাসান, ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী

আবেদন জটিল, অর্থ পেতে বছরের পর বছর

বৃত্তির পরিমাণ কম হওয়ার পাশাপাশি আবেদন ও অর্থ বিতরণপ্রক্রিয়াতেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবেদন করতে হয়। আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট হল থেকে ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করে বিভাগে জমা দিতে হয়। বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরের পর আবার সেটি হলে জমা দিতে হয়। পরে হল প্রাধ্যক্ষের স্বাক্ষর শেষে আবেদন হিসাব শাখায় পাঠানো হলে ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হিসাবে টাকা পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ আবেদন করতে না পারলে পরে তিনি আর সেই বৃত্তির টাকা পান না।

এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের (৫১তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী মুখলাতুল জিনান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য রয়েছে। তাই বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রকাশের পর সরাসরি হিসাবে টাকা পাঠানো সম্ভব। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় আবেদনপ্রক্রিয়ার কারণে ভোগান্তি তৈরি হয়। কেউ নির্ধারিত সময়ে আবেদন করতে না পারলে তাঁর বৃত্তির টাকাও আর দেওয়া হয় না। পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেশনের (স্বয়ংক্রিয়তা) আওতায় আনা উচিত।’

এদিকে পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরও বৃত্তির টাকা পেতে শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

আমরা ইতিমধ্যে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। কিন্তু অনার্সের চতুর্থ বর্ষের বৃত্তির টাকা এখনো পাইনি। সময়মতো বৃত্তির টাকা পেলে সেটি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের সময় কাজে লাগত।
জাহিদ হাসান, ৪৯তম ব্যাচ, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের (৪৯তম ব্যাচ) থেকে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের (৫৫তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অধ্যয়ন করছেন। কয়েকটি বিভাগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের (৪৮তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরাও স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। অথচ এখনো ৪৮ ও ৪৯তম ব্যাচের স্নাতকের চতুর্থ বর্ষ, ৫০তম ব্যাচের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ, ৫১তম ব্যাচের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ এবং ৫২তম ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষের বৃত্তির অর্থ বকেয়া রয়েছে।

এ বিষয়ে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের (৪৯তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। কিন্তু অনার্সের চতুর্থ বর্ষের বৃত্তির টাকা এখনো পাইনি। সময়মতো বৃত্তির টাকা পেলে সেটি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের সময় কাজে লাগত।’

এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ বলেন, সাধারণত কোনো শিক্ষাবর্ষের সব বিভাগের পরীক্ষা শেষ হলে তারপর টাকাটা একসঙ্গে সবাইকে দেওয়া হয়। এখানে কয়েকটি বিভাগ আছে, যাদের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় দেরিতে পরীক্ষা শেষ হয়। সে ক্ষেত্রে বৃত্তির টাকা পাঠাতে দেরি হয়ে থাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার

সরকারি বৃত্তিও দেওয়া হয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তির বাইরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সাধারণ বৃত্তি ও মেধাবৃত্তি নামে দুটি বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর ২৮১ শিক্ষার্থী সাধারণ বৃত্তি পান। তাঁরা মাসে ৪৫০ টাকা এবং এককালীন ৯০০ টাকা এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পান। অন্যদিকে মেধাবৃত্তি পান ১৬ শিক্ষার্থী। তাঁরা মাসে ১ হাজার ১২৫ টাকা, এককালীন ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং স্নাতকোত্তরে বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পান।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি) একটি বৃত্তি দিয়ে থাকে। এই বৃত্তির আওতায় অনুষদভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলকারী ছয়জন এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি ব্যাচে স্নাতকে চার বর্ষে চারজন বৃত্তি পান। এই বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা, বই কেনার জন্য এককালীন দুই হাজার টাকা এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পান।

একই ফলাফলে একাধিক ট্রাস্ট বৃত্তি

বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ট্রাস্টভিত্তিক বৃত্তিগুলোর একটি বড় অংশ একই ধরনের মেধার মানদণ্ডে দেওয়া হয়। কোনোটিতে অনুষদে প্রথম আবার বিভাগে প্রথম হওয়ার শর্ত, কোনোটিতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়ার শর্তে দেওয়া হয়। ফলে একই শিক্ষার্থীর একাধিক ট্রাস্ট বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

সর্বশেষ যে সিনেট অধিবেশন হয়েছে, সেখানেও জাকসুর প্রতিনিধিরা সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। আমরা বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি কমিটিও করেছি। ওই কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বৃত্তির টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সহউপাচার্য (প্রশাসন)

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্নাতকে প্রথম বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে ছয় অনুষদের সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আকলিমা আনোয়ার ট্রাস্ট ফান্ড এবং মেজর জেনারেল আবদুল মান্নান সিদ্দিকী ট্রাস্ট ফান্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফলাফলকারীদের জন্য রয়েছে মীর মুয়াজ্জেম আলী ও অজিফা আলী বৃত্তি, আসাদুল কবির স্বর্ণপদক ও বৃত্তি, ড. সুরত আলী খান স্বর্ণপদক এবং শরফুদ্দিন স্বর্ণপদক ও বৃত্তি। আবার বিভাগভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলকারীদের জন্য রয়েছে শহীদ হাকিম মো. সাঈদ বৃত্তি, আমিনা আইনউদ্দিন মেমোরিয়াল বৃত্তি, সালাউদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড, কামরুল হোসেন চৌধুরী ট্রাস্ট ফান্ড, অধ্যাপক আবু রুশদ মতিনউদ্দিন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড, রহিমা-হাকিম ট্রাস্ট ফান্ডসহ আরও কয়েকটি বৃত্তি।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সর্বশেষ যে সিনেট অধিবেশন (২৭ জুন) হয়েছে, সেখানেও জাকসুর প্রতিনিধিরা সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। আমরা বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি কমিটিও করেছি। ওই কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বৃত্তির টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে।’