মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে তিন খুনের ঘটনায় পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার পর আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালত থেকে আসামিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে তিন খুনের ঘটনায় পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার পর আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালত থেকে আসামিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

বাহরাইনে মারা যাওয়া এক বোনের সম্পত্তি নিয়ে ভাগনেদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে তিন খুন, পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড

বাহরাইনে মারা যাওয়া এক বোনের জমি ও টাকাপয়সার ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ে আরেক বোনের ছেলেদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় তিন খুনের মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত। আট আসামিকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়। অপর সাত আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মানিকগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ এস কে এম তোফায়েল হাসান এ রায় দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন সিঙ্গাইরের গোবিন্দল গ্রামের মো. জিয়ার উদ্দিন (৫০), জাহিদুল ইসলাম (৫৫), আবদুর রশিদ (৫০), জসিম উদ্দিন (৪৫) ও সিদ্দিক মিয়া (৫৫)। পাশাপাশি তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কাজের জন্য বাহরাইনে যান হাসিনা আক্তার। বিদেশে থাকা অবস্থায় হাসিনা আক্তার বড় বোন রাজিয়ার কাছে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা পাঠান। ওই টাকায় প্রায় ৩৬ শতক জমি কেনা হয়। বাকি টাকাগুলো রাজিয়ার ছেলে আবদুর রশিদ, জাহিদুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া ওই জমিও তাঁরা ভোগদখল করে আসছিলেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন একই গ্রামের জহির উদ্দিন (৭৫), মো. আজিজুল (৪৩), উজ্জ্বল হোসেন (৪৫), সামছুল হক (৭৫), মো. সালাউদ্দিন (৫৫), মাজেদ মিয়া (৪৫), মো. মরণ (৪৭), স্বপন মিয়া (৩৮)। তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া আসামি শামীম হোসেন ও হাবু মিয়াকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অনাদায়ে আরও দুই মাসের করাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত আসামি মজনু মিয়াকে এক বছর, আসামি রাজিয়া খাতুন ও সুফিয়া খাতুনকে ছয় মাস এবং আসামি সাহেরা খাতুন ও খাতুনী বেগমকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া দেন। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া হওয়ায় আদালত আসামি উজ্জ্বল মিয়া, অলি আহাদ, মো. শুকুর ও মো. রাজাকে খালাস দেন।

এজাহার এবং আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের মৃত দিরগজ মোল্লার তিন ছেলে নান্নু মোলা, অহেদ আলী মোল্লা ও করিম মোল্লা এবং তিন মেয়ে রাজিয়া বেগম, হেলেনা বেগম ও হাসিনা আক্তার। কাজের জন্য বাহরাইনে যান হাসিনা আক্তার। বিদেশে থাকা অবস্থায় হাসিনা আক্তার বড় বোন রাজিয়ার কাছে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা পাঠান। ওই টাকায় প্রায় ৩৬ শতক জমি কেনা হয়। বাকি টাকাগুলো রাজিয়ার ছেলে আবদুর রশিদ, জাহিদুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া ওই জমিও তাঁরা ভোগদখল করে আসছিলেন।

নিঃসন্তান হাসিনা আক্তার বাহরাইনে মারা গেলে তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়। এর পর থেকে এসব অর্থ ও জমির ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ে মামাদের সঙ্গে ভাগনেদের বিরোধ চলে আসছিল। এ নিয়ে গ্রামে একাধিকবার সালিসও হয়। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।

২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে জমি ও টাকাপয়সার ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ে বল্লম, টেঁটা, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করেন আসামিরা। এতে ঘটনাস্থলে নান্নু মোল্লা (৬০) ও তাঁর চাচাতো ভাই আজিজ মোল্লা (৫০) মারা যান। হামলায় গুরুতর আহত হন নান্নুর ভাই কমির মোল্লা (৪৮) ও নান্নুর স্ত্রী কমলা বেগম (৪৫)। ওই দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করিম মোল্লা মারা যান।

এই ঘটনার পরদিন নিহত আজিজ মোল্লার স্ত্রী ফরিদা বেগম বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তা সিঙ্গাইর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুর রহমান ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। মামলায় মোট ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নূরতাজ আলম বাহার। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী খলিলুর রহমান।

পিপি নূরতাজ আলম বাহার বলেন, ১০ বছর পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালতের বিচারক আলোচিত এই তিন হত্যা মামলায় পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড, আটজনকে যাবজ্জীবন এবং সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চারজনকে খালাস দেন।

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী খলিলুর রহমান বলেন, এ রায় যথোপযুক্ত হয়নি। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলে তিনি জানান।