হাকালুকি হাওরে ডুবে যাওয়া ধানখেতের দিকে বিমর্ষ হয়ে তাকিয়ে আছেন দুই বন্ধু নূরুল ও আল-আমিন। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম ইউনিয়নের বাছিরপুর গ্রামে
হাকালুকি হাওরে ডুবে যাওয়া ধানখেতের দিকে বিমর্ষ হয়ে তাকিয়ে আছেন দুই বন্ধু নূরুল ও আল-আমিন। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম ইউনিয়নের বাছিরপুর গ্রামে

‘ব্ল্যাক রাইসের’ সঙ্গে ডুবে গেছে দুই বন্ধুর স্বপ্নও

হাকালুকি হাওরে তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধানের আবাদ করেছিলেন দুই বন্ধু নূরুল তাপাদার (৩২) ও আল-আমিন (৩০)। ফলনও ভালো হয়েছিল। অন্য ধানের চেয়ে এ জাতের ধানের বাজারমূল্য প্রায় দ্বিগুণ। তাই এটি চাষে ঝোঁকেন তাঁরা। কালো ধানের চাষ করে বাড়তি আয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন দুজন। কিন্তু সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে অন্যান্য কৃষকের মতো তাঁদের জমির ফসলও পানিতে ডুবে গেছে, সঙ্গে ডুবে যায় তাঁদের স্বপ্নও।

নূরুল ও আল-আমিনের বাড়ি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর গ্রামে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের দিকে বাড়ির উঠানে ধান শুকানোর একটি যন্ত্র (ড্রায়ার) মেরামত করছিলেন নূরুল। আল-আমিনও তাঁকে সহযোগিতা করছিলেন। অনেক চেষ্টা চালিয়েও যন্ত্রটি সচল করা যায়নি। একপর্যায়ে দুই বন্ধু হতাশ হয়ে পড়েন। সরকার ভর্তুকিমূল্যে যন্ত্রটি অন্য এক কৃষককে দিয়েছিলেন। পরিচর্যার অভাবে এটি অকেজো হয়ে পড়েছে।

আল-আমিন বললেন, ‘হাওরের কইয়েরকোনা বিলের ওপরের দিকে তিন বিঘা জমি দুই বন্ধু বর্গা নিয়া ব্ল্যাক রাইসের আবাদ করছিলাম। সব ধান পানির নিচে। একমুঠও কাটিয়া আনতাম পারছি না।’

প্রচলিত ধানের বাইরে কালো ধান আবাদ করার কারণ সম্পর্কে নূরুল জানান, ২০২৪ সালে একটি বীজ কোম্পানি থেকে কৌতূহলী হয়ে ওই ধানের দুই কেজি বীজ কিনে আনেন তাঁরা। শুরুতে আধা বিঘা জমিতে আবাদ করে ভালো ফলন পান। ধান ভাঙিয়ে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে চাল বিলিয়ে দেন। তবে অভ্যস্ত না থাকায় ওই চাল খেয়ে কেউ তৃপ্তি পাননি। পরের বছর ২০২৫ সালে চার কেজি বীজ কিনে এক বিঘা জমিতে আবাদ করেন। ওই বছর প্রায় ২০ মণ ধান পান।

নূরুল বলেন, ‘গতবারের ধান নিয়া বিপদে পড়লাম। এলাকার কেউ কিনতে চায় না। পরে কৃষি অফিস থাকি মঞ্জুরুল আলম নামের কুমিল্লার এক ব্যক্তির ঠিকানা পাইলাম। ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানালাম। উনি বললেন, প্রতি মণ ধান ২ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনবেন। বড় টেনশন (দুশ্চিন্তা) থাকি বাঁচলাম। পরে উনি কিনে নিলেন। তবে বীজের লাগি কিছু ধান ঘরে রাখি।’

নূরুল জানান, সব ধানের উৎপাদন খরচ সমান। অন্যান্য জাতের ধানের মণপ্রতি বাজারদর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা। খাদ্যগুদামে বিক্রি করলে প্রতি মণ ধানের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা (প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে) মেলে। সেখানে কালো ধানের বাজারমূল্য প্রায় দ্বিগুণ। এটির রোগবালাইও কম। তিনি বলেন, ভালো দাম পাওয়ায় কালো ধান চাষে উৎসাহ বেড়ে যায়। এবার বন্ধু আল-আমিনও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন।

দুই বন্ধু জানান, কুমিল্লার মঞ্জুরুল আলম দেশের বিভিন্ন এলাকার চাষিদের কাছ থেকে কালো ধান কিনে চাল তৈরি করেন। তিনি (মঞ্জুরুল) ওই চাল প্যাকেটজাত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করেন। এবার মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ কালো ধানের বিক্রয়মূল্য আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাঁরা জানান, এবার ৩ বিঘায় তাঁরা অন্তত ৬০ মণ ধান পেতেন। পর্যায়ক্রমে আরও বিস্তৃতভাবে এ ধান আবাদের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু কালো ধানের সঙ্গে তাঁদের স্বপ্নও ডুবে গেছে।

কালো চালে উচ্চমাত্রার অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া এসব চাল ফাইবার, প্রোটিন ও আয়রনসমৃদ্ধ। এসব তথ্য জানিয়ে উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, কালো চালে সাদা চালের চেয়ে বেশি পুষ্টিগুণ রয়েছে। হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখার পাশাপাশি এটি ওজন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এ ছাড়া শরীরকে ‘ডি–টক্সিফাই’ করতে কার্যকর।

শুধু কালো ধান নয়, হাওরে অনেক কৃষকের পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে উল্লেখ করে ওই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এবার নূরুল ও আল-আমিনের মতো হাওর এলাকার অনেক কৃষক ফসল হারিয়ে দিশাহারা। সরকার তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।