মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, লেয়াকত আলী
মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, লেয়াকত আলী

যে কারণে বিএনপির ‘নিশ্চিত’ আসন বাঁশখালী হাতছাড়া

বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী)। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের বিগত তিনটি একক নির্বাচন (২০১৪ থেকে ২০২৪) ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক তিনটি (১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮) সংসদ নির্বাচনে এ আসনটিতে বিএনপি জিতেছে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম হলো—জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থী।

নেতা–কর্মী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি প্রার্থীর হারার পেছনে চারটি কারণ আলোচনায় রয়েছে—সাংগঠনিক দুর্বলতা, শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীকে থামাতে না পারা, ১১ হত্যা মামলার আসামিকে প্রধান সমন্বয়ক করা ও ত্যাগী নেতাদের দূরে সরিয়ে রাখা।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা, দলে কোন্দল না থাকা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান থাকায় প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা ও কৌশলে এগিয়ে থাকায় প্রথমবারের মতো জয় পায় বাঁশখালীতে।

গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। সাতকানিয়া আসনটির বিষয়ে সবার ধারণা থাকলেও বাঁশখালীতে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করায় চমক সৃষ্টি হয়।

নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ৮৯ হাজার ৯৬০ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী ৮২ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৭১ ভোট পেয়েছেন।

মিশকাতুল ইসলাম সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাঁশখালী আসনে জাফরুল বিএনপিকে জয় এনে দিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে যখন বিএনপির ভরাডুবি হয়েছিল, তখনো এই আসন বিএনপির ঘরে ছিল। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে একক নিয়ন্ত্রণ ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের।

নেতা–কর্মীরা জানান, বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত বাঁশখালীতে এবার পরাজয়ের কারণ হিসেবে প্রথমে উঠে আসছে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা। একজন প্রার্থীকে জয়ী করে আনতে দলের পক্ষ থেকে কোনো তৎপরতা ছিল না। সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে বাবার পরিচয় দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে যেতে চেয়েছিলেন মিশকাতুল।

অভিযোগ রয়েছে, দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে দীর্ঘদিন এলাকায় না থাকা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলমগীর কবির চৌধুরী, সাবেক ছাত্রদল নেতা শাখাওয়াত জামালসহ নিজের পছন্দের লোক দিয়ে প্রচারণা চালানোর কারণে দলের ত্যাগী নেতা–কর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নেন।

এ ছাড়া প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট করা হয় আমিনুর রহমান চৌধুরীকে। তিনি বাঁশখালীতে ১১ সংখ্যালঘুকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। ১১ হত্যা মামলার আসামিকে প্রধান সমন্বয়কারী করায় সংখ্যালঘুসহ সাধারণ ভোটাররা ছিলেন আতঙ্কে। ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বর বাঁশখালীর সাধনপুরে ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

বাঁশখালীর গন্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৭১ ভোট পেয়েছেন। তাঁর ভোটের মধ্যে বিএনপির নেতা–কর্মীদের ভোটও রয়েছে। নেতা–কর্মীরা বলেন, এই ভোট মিশকাতুলের প্রাপ্ত ভোট ৮২ হাজার ২৩৭–এর সঙ্গে যুক্ত হলে অনায়াসে তিনি জয়লাভ করতে পারতেন। লেয়াকত আলীকে খুবই হালকাভাবে দেখা হয়েছিল। এত ভোট তিনি পাবেন, এ ধারণা ছিল না।

এসব বিষয়ে জানতে বাঁশখালীতে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আমিনুর রহমান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গন্ডামারা ও শেখেরখীলে আমরা কাজ করতে পারিনি।’ এ ছাড়া পরাজয়ের জন্য বিদ্রোহী প্রার্থী লেয়াকত আলীকে দায়ী করেন তিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে নির্বাচনী কৌশলে নিজেদের কিছুটা সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা স্বীকার করেন আমিনুর রহমান চৌধুরী।

জানতে চাইলে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা লেয়াকত আলী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জনপ্রিয়তা আছে বলেই ৫৫ হাজার ভোট পেয়েছি। আমাকে মনোনয়ন দিলে বিএনপি জয় পেত।’

বাঁশখালী আসন বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চন্দনাইশ অন্য দলের আসন হিসেবে পরিচিত থাকলেও আমরা সাংগঠনিক তৎপরতা ও প্রচারণায় ধানের শীষের জয় এনেছি। কিন্তু বাঁশখালীর বিষয়ে আমাদের ওইভাবে অবগত করা হয়নি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ৬৬ হাজার ৩৪২ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থী খোরশেদ আলম পেয়েছিলেন ৫২ হাজার ৮৯০ ভোট। আর বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী আলমগীর কবির চৌধুরী পেয়েছিলেন ২১ হাজার ৩৬৫ ভোট। বিএনপির আরেক প্রার্থী লেয়াকত আলী পেয়েছিলেন ১৮ হাজার ১৩৭ ভোট।

জহিরুল ইসলাম শেখেরখীল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। জহিরুলের বাবা মাওলানা ইসহাকের এলাকায় বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। আগের নির্বাচন করায় জহিরুলের অভিজ্ঞতা, ৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামীর ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা, প্রার্থী নিয়ে কোন্দল না থাকায় জামায়াতের প্রার্থী এখানে জয়ী হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন বলে মনে করছে দলটি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির আসন বাঁশখালী হারানোর কারণগুলো বের করে ভবিষ্যতের জন্য আমরা সতর্ক হব।’