
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনাবাহিনীর অভিযানে আটকের পর মারা যাওয়া বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান ডাবলুর (৫২) মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
শামসুজ্জামানের মরদেহ আজ মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পৌঁছায়। ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের পরামর্শক আবদুর রহমানসহ পাঁচ চিকিৎসককে নিয়ে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
এর আগে গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল জীবননগর পৌর এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানকালে শামসুজ্জামানকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হাফিজা ফার্মেসি থেকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক রাত সাড়ে ১২টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন।
শামসুজ্জামানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল গভীর রাতে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরা রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সড়কে কাঠের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। আজ সকালে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, জড়িতদের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা রাস্তা ছাড়বেন না। তাঁরা ময়নাতদন্তের জন্য লাশও হস্তান্তর করবেন না।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জীবননগরে আন্দোলনস্থলে যান। তাঁরা দুজন আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে কথা বলেন। তাঁদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. শরীফুজ্জামান কথা বলেন। তাঁদের বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীরা শান্ত হন। শামসুজ্জামানের মরদেহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গায় পাঠানো হয়।
জীবননগরে ডিসি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের কেউই রেহাই পাবে না। সর্বোচ্চ মহলে রাতেই কথা হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, তদন্ত করে যদি জানা যায় এটা হত্যাকাণ্ড, তাহলে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভোরবেলায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়েছি। তাঁর উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য আমি নিজে লাশ নিতে এসেছি, যাতে পোস্টমর্টেমে কোনো ভেজাল না হয়। পোস্টমর্টেমে যদি হত্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
এসপি মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বিএনপি নেতা শামসুজ্জামানের মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এ রকম একজন নেতার মৃত্যুতে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলাসহ সবকিছু হবে। আমাদের বাহিনী ও সরকারের পক্ষ থেকে যে ব্যবস্থা আছে, সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব।’
বিএনপির নেতা মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘হিসাব পরিষ্কার। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কেউ যদি আইনের বাইরে কাজ করে, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। যারা আইন হাতে তুলে নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের বিচার হবে। আমি যদি আইনবিরোধী কাজ করি, আমার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিএনপির নেতা মো. শরীফুজ্জামান বলেন, ‘ডিসি-এসপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমি ও জেলা বিএনপির সভাপতি সার্বক্ষণিক থাকব, যতক্ষণ পোস্টমর্টেম শেষ না হবে; এখানে কোনো ছলচাতুরি, কোনো নাটক যাতে সৃষ্টি না হয়।’
জীবননগর শহরের বসুতিপাড়ার বাসিন্দা শামসুজ্জামান ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী জেসমিন খাতুন গৃহিণী। তিন সন্তানের মধ্যে মেয়ে একজন, বাকি দুজন ছেলে।
শামসুজ্জামানের বড় ভাই শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁর ভাইয়ের নামে আওয়ামী লীগের আমলে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক মামলা ছিল। সেনাবাহিনী মূলত যুবদল নেতা ময়েন চেয়ারম্যানকে ধরতে গিয়েছিল। ময়েনকে না পেয়ে তাঁর ভাইয়ের কাছে ওই নেতার বিষয়ে জানতে চান। একপর্যায়ে ভাইকে ধরে মোতালেব হাজির মার্কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভাইকে মারধর করা হয়। মারপিটের কারণে তাঁর ভাই মারা যান।
এসব কীভাবে জানলেন—জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে খোঁজ করতে থাকি। একপর্যায়ে মোতালেব হাজির মার্কেটের অফিসকক্ষের দরজার কাছে গেলে ভাইয়ের চিৎকার শুনতে পাই। তাঁর হাত-পা, পিঠে লাঠির আঘাত আছে। এ ব্যাপারে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আইনি পদক্ষেপ নেব।’
আজ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিএনপি নেতার মৃত্যুর ঘটনায় সেখানকার ক্যাম্প কমান্ডারসহ সব সেনাসদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের জন্য একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।