বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে বন বিভাগের অভিযানে গ্রেপ্তার চারজন। ২৮ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের মারকির খাল এলাকায়
বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে বন বিভাগের অভিযানে গ্রেপ্তার চারজন। ২৮ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের মারকির খাল এলাকায়

সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরলেও প্রমাণ করা যায় না

সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালায় বন বিভাগ। এসব অভিযানে বিষের বোতল, জাল, মাছ ও নৌকা জব্দ হয়। কিন্তু মামলা আদালতে যাওয়ার পর প্রশ্ন তোলা হয়, জব্দ করা মাছ বিষ প্রয়োগ করেই ধরা হয়েছে, তার প্রমাণ কী?

সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার একাধিক ঘটনায় আদালতে বারবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। দ্রুত নমুনা পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় মাছের শরীরে বিষের উপস্থিতি এবং বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা কঠিন।

সাতক্ষীরা বন আদালতে বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরেস্টার জিয়াউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বন বিভাগের নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। নমুনা কোথায় পাঠালে দ্রুত পরীক্ষা করা যাবে, তা নিয়েও জটিলতা রয়েছে। অন্যদিকে বিষসহ অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করলেও রাসায়নিক পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে আদালতেও বিষয়টি প্রমাণ করা যায় না।

তিন মাসে ৩৪ মামলা

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের (খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা) তথ্য অনুযায়ী, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনায় ৩৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৭ জনকে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৫ জন। এ ছাড়া ৫৯টি বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা ১৬৭ কেজি চিংড়ি ও ১০০ কেজি অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ৮৯টি নৌকা ও ৭০টি অবৈধ মাছ ধরার জাল জব্দ করে বন বিভাগ।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরার একটি ঘটনায় মাছ জব্দের পর নমুনা পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পাঠানো হয়েছিল। সেখানে পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৫ দিন লেগে যায়। তত দিনে মাছের নমুনায় বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

খুলনার জেলার কয়রা বন আদালতে বন বিভাগের করা বিষ দিয়ে মাছ ধরার ১০টি মামলার নথি পর্যালোচনা করেছে প্রথম আলো। এতে দেখা যায়, ঘটনাস্থল থেকে বিষের বোতল, মাছ এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দের বিবরণ রয়েছে। এর মধ্যে কোনো মামলায় তিনটি বিষের বোতল ও ১০ কেজি চিংড়ি, কোনো মামলায় চারটি বোতল ও ৯ কেজি চিংড়ি জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরেক ঘটনায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বিষের বোতল ও ৩৮ কেজি চিংড়ি জব্দের বিবরণ রয়েছে।

সুন্দরবনে বন বিভাগের একটি টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, কিছুদিন আগে বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা মাছসহ দুজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেল নিরীহ জেলে এবং বন কর্মকর্তারা ঘুষ না পেয়ে তাঁকে ফাঁসিয়েছেন। মাছ বিষ দিয়ে ধরা হয়নি বলেও আদালতে দাবি করেন তিনি।

বিষাক্ত পানি ভাটার টানে ছড়িয়ে পড়লে জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন ওই বন কর্মকর্তা।

বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো এক জেলে সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অল্প সময়ে বেশি মাছ ধরার আশায় বিষের ব্যবহার শুরু করেন। সুন্দরবনের খালে কীটনাশক (বিষ) প্রয়োগ করলে মাছ দ্রুত ভেসে ওঠে। পরে সেই মাছ বাজারে বিক্রি করতেন।

ঝুঁকি কতটা

পরিবেশবিদেরা বলছেন, সুন্দরবনের খালে বিষ প্রয়োগ করলে মাছের পাশাপাশি অন্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ খেলে মানুষের শরীরেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

সুন্দরবন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বিষাক্ত পানি ভাটার টানে ছড়িয়ে পড়লে জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ শনাক্তের জন্য কিট (মাছে বিষের উপস্থিতি শনাক্ত করা যাবে) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২২ আগস্ট খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় এই উদ্যোগের কথা জানন বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এ বিষয়ে কাজ করছে, তবে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

ইমরান আহমেদ বলেন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন। পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।

সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; অপরাধ প্রমাণের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বন অপরাধের মামলায় যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।
মো. আজহারুল ইসলাম, সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, বন আদালত

শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়

সুন্দরবনের জলজ সম্পদ নিয়ে কাজ করা একজন গবেষকের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে প্রথম আলো। মাছের প্রজাতি গণনার কাজে গত ছয় মাসে একাধিকবার তিনি কয়রার বাজারে গেছেন তাঁরা। বাজারে তীব্র গন্ধযুক্ত চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ পেয়েছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের মাছের একটি অংশ ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যায়। তবে শুধু গন্ধ দিয়ে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ ধরা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এ জন্য সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার মতো অপরাধ প্রমাণের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বন আদালতের সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আজহারুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; অপরাধ প্রমাণের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বন অপরাধের মামলায় যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।