চাষাঢ়ায় বোমা হামলা

২২ বছরেও শেষ হয়নি বিচার 

বোমা হামলা মামলায় ১০৩ জনকে সাক্ষী করা হলেও সাক্ষ্য দিয়েছেন ২২ জন। বাকি সাক্ষীরা না আসায় ঝুলে আছে বিচার কার্যক্রম।

বোমা হামলায় নিহত আক্তার হোসেনের স্ত্রী শাহনাজ বেগম ও ছেলে সাফকাত হোসাইন। পুরোনো অ্যালবামে পারিবারিক ছবি দেখতে দেখতে বিচার না হওয়ায় ক্ষোভের কথা জানালেন এই মা-ছেলে। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের উত্তর চাষাঢ়া এলাকায়
ছবি: দিনার মাহমুদ

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় ২০০১ সালের ১৬ জুন স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলা মামলায় বিচারকার্য শেষ হয়নি ২২ বছরেও। ওই হামলায় ২০ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আজও বিচার না পাওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘশ্বাস আহত ব্যক্তিদেরও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোমা হামলার ঘটনায় মামলায় তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১০ বছর আগে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। কিন্তু সাক্ষী না আসায় বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এই মামলায় ১০৩ জনকে সাক্ষী করা হলেও বাদীসহ মাত্র ২২ সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। অন্য সাক্ষীরা না আসায় মামলার বিচার কার্যক্রম ঝুলে আছে।

মামলার বাদী ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা প্রথম আলোকে বলেন, সমন জারি করলেও সাক্ষীরা সাক্ষ্য প্রদান করতে না আসায় মামলার বিচারকার্য বিলম্বিত হচ্ছে। তাই আগামী ২০ জুলাই ধার্য তারিখে সাক্ষীদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জন্য আদালতে আবেদন জানানো হবে।

২০০১ সালের ১৬ জুন রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত গণসংযোগ কর্মসূচিতে বোমা হামলায় ২০ জন নিহত হন। বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন সাইদুল হাসান, আক্তার হোসেন, মোশারফ হোসেন, নজরুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন ভাষানী, সাইদুর রহমান মোল্লা, নজরুল ইসলাম, স্বপন চন্দ্র দাস, শওকত হোসেন, স্বপন দাস, এনায়েত উল্লাহ, পলি বেগম, হালিমা বেগম, আবদুল আলীম, শুক্কুর আলী, নিধুরাম বিশ্বাস, রাজিয়া বেগম, আবদুস সাত্তার, আবু হানিফ নবী ও অজ্ঞাত নারী।

দেশে এত হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়, কিন্তু ১৬ জুন বোমা হামলার বিচার হয় না কেন? আমরা বোমা হামলা মামলার বিচার দেখে যেতে চাই। 
শাহানা বেগম, আক্তার হোসেনের স্ত্রী 

ওই ঘটনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন। এক যুগ পর ২০১৩ সালের ২ মে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে ৫৬ জনকে সাক্ষী করে আদালতে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে আদালতে আবেদন করে সাক্ষী বাড়িয়ে ১০৩ জন করা হয়।

সিআইডির অভিযোগপত্রের আসামিরা হলেন মহানগরের ওই সময়ের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শাহাদাৎউল্লাহ; হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান; হুজি সদস্য দুই ভাই আনিসুল মোরসালীন, মাহবুবুল মুত্তাকিন; নগরীর উত্তর চাষাঢ়ার বাসিন্দা ওবায়দুল হক ও বিএনপি নেতা শওকত হাশেম।

আসামিদের মধ্যে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বর্তমানে শাহাদাৎউল্লাহ কারাগারে আছেন। দিল্লিতে জঙ্গি হামলার অভিযোগে দুই ভাই আনিসুল মোরসালীন ও মাহবুবুল মুত্তাকিন ভারতের কারাগারে আটক। ওবায়দুল হক দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আর শওকত হাশেম উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটির ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।

বোমা হামলায় আহত হন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা–কর্মী। তাঁদের মধ্যে দুই পা হারান সেই সময়ের কৃষক লীগ নেতা চন্দন শীল ও যুবলীগ নেতা রতন দাস। চন্দন শীল বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। ১৬ জুন বোমা হামলার ঘটনাসহ দেশের সব বোমা হামলা একই সূত্রে গাঁথা বলে তিনি মনে করেন।

প্রথম আলোকে চন্দন শীল বলেন, ‘দেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে বোমা হামলাগুলো চালানো হয়েছিল। এই বোমা হামলায় মুফতি হান্নানসহ কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। আমরা এই বোমা হামলার নির্দেশদাতা ও প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’

ওই দিনের বোমা হামলায় নিহত হন শহরের উত্তর চাষাঢ়া এলাকার নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের সাবেক জিএস আক্তার হোসেন ও তাঁর ছোট ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক মোশারফ হোসেন। বোমা হামলায় পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারগুলো অর্থকষ্টে অমানবিক জীবন যাপন করছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আক্তার হোসেনের স্ত্রী শাহানা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে এত হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়, কিন্তু ১৬ জুন বোমা হামলার বিচার হয় না কেন? আমরা বোমা হামলা মামলার বিচার দেখে যেতে চাই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি চাই। বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে সহায়তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছি।’

স্বামী হত্যার বিচার না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বোমা হামলায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী হামিদা ইসলামও। তিনি বলেন, ‘২২ বছরেও স্বামী হত্যার বিচার পেলাম না। আমার সন্তানেরা তার বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারল না। যারা এতগুলো পরিবারকে ধ্বংস করল, তাদের বিচার চাই, বিচার না হওয়া পর্যন্ত খুনিদের বিচার চেয়ে যাব।’

সাক্ষীদের না পাওয়ায় মামলার বিচারকার্য বিলম্বিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারী কৌঁসুলি মনিরুজ্জামান বুলবুল। তাঁর ভাষ্য, সাক্ষীদের নাম ও ঠিকানা অনুযায়ী সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সাক্ষীদের খুঁজে বের করতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা কাজ করছেন।