শিশু নির্যাতন
শিশু নির্যাতন

রাজশাহী মেডিকেলে মাদ্রাসার সেই শিশুশিক্ষার্থীর অবস্থার অবনতি, আপসের জন্য চাপ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন মাদ্রাসার সেই শিশুশিক্ষার্থীর (১০) অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। প্রাথমিক গাইনি পরীক্ষায় শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটির অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। তাকে আইসিইউতে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে এ ঘটনায় করা মামলা না চালিয়ে আপসের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। এমনকি অন্য জায়গায় নিয়ে শিশুটির চিকিৎসার জন্য মাদ্রাসার পরিচালকের পক্ষ থেকে শিশুটির বাবার কাছে লোক পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে এসেছিলেন মাদ্রাসা পরিচালকের পক্ষে চার ব্যক্তি। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে মাদ্রাসার পরিচালক নিজেও ফোন করে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন বলে জানান শিশুটির বাবা।

সংকটাপন্ন অবস্থায় গত সোমবার সকালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার একটি মাদ্রাসার ওই শিশুশিক্ষার্থীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটি কিছুক্ষণ পরপর আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠছে। অবস্থার অবনতি হলে সোমবারই শিশুটিকে আইসিইউতে পাঠানো হয়। প্রাথমিক গাইনি পরীক্ষায় শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

এ ঘটনায় শিশুটির মা ভেড়ামাড়া থানায় মামলা করেছেন। ভেড়ামারা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটির মা বাদী হয়ে ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেছেন। এই মামলায় মাদ্রাসার পরিচালক, সহযোগী হিসেবে তাঁর স্ত্রী ও একজন নারী শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার তাঁদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

শিশুটির বাবা হাসপাতালে রয়েছেন। তিনি বলছেন, রোববার রাতেই মাদ্রাসার পরিচালক তাঁকে ফোন করে মামলার মধ্যে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি আপস করে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে মাদ্রাসার পরিচালকের পক্ষ থেকে চার ব্যক্তিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। মেয়ের বাবা জানান, তিনি কাউকে নিজের মুঠোফোন নম্বর দেননি। কিন্তু একজন নার্সের মাধ্যমে ওই চার ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁরা বলে গেছেন, মামলা বাদ দিয়ে হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা করালে মেয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। চিকিৎসার খরচ তাঁরা বহন করবেন। শিশুটির বাবা জানিয়েছেন, তিনি ওই চার ব্যক্তিকে বলে দিয়েছেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা না হলে মেয়েকে তিনি ঢাকায় নিয়ে যাবেন। সেখানে না হলে ভারতে নিয়ে যাবেন। তবু তাঁদের কথায় তিনি মেয়েকে বাইরে নিয়ে যাবেন না।

শিশুমেয়েটিকে সাত-আট মাস আগে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিল পরিবার। ওই মাদ্রাসার নিচতলায় পরিচালক তাঁর পরিবার নিয়ে থাকেন। আর দোতলায় মাদ্রাসার শিশুশিক্ষার্থীদের রাখা হয়। খাওয়াদাওয়ার জন্য তাদের নিচে আনা হয়।

শিশুটির মায়ের ভাষ্য, মেয়েকে ভর্তির পরই তিনি খবর পেয়েছিলেন মাদ্রাসায় শিশুদের নির্যাতন করা হয়। তাই দুই–তিন মাস আগে মেয়ের ভর্তি বাতিল করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাদ্রাসার পরিচালকের স্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সেখানেই মেয়ে ভালো থাকবে আর কোনো ঝামেলা হবে না। আশ্বাস পেয়ে তিনি মেয়েকে রেখে আসেন। এর মধ্যে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। মেয়ে জানিয়েছিল ঈদের ছুটিতে তাকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

মা গত রোববার মেয়েকে আনতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন মেয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন, পেট ফুলে গেছে। কোনো এক আঘাতের কারণে বাঁ পা–ও ফুলে গেছে। এ বিষয়ে তাঁরা তাঁকে কিছুই জানাননি। মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে চাইলে মাদ্রাসার পরিচালকের স্ত্রী বলেন, ‘আপনার মেয়ের কিছুই হয়নি, বাড়িতে নিয়ে যান।’

পরে গতকাল সোমবার মেয়েটিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। শিশুটির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস সোমবার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বাচ্চাটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। নিজে থেকে কিছু বলছে না। তবে প্রাথমিক অবস্থায় যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে। নিশ্চিতকরণের জন্য ইতিমধ্যে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আরও নিশ্চিত পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য বাচ্চাটিকে গাইনি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।

গাইনি পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুটির সতীচ্ছদ পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শংকর কে বিশ্বাস বলেন, যোনিপথ ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা ধর্ষণের কারণে হতে পারে, আবার অন্যভাবেও হতে পারে। গাইনি বিভাগের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে, শিশুটি ধর্ষণ শিকার হয়েছে কি না।