বাগান থেকে সংগ্রহ করা আনারস স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি রাঙামাটির নানিয়ারচরের ধার্যেছড়ি এলাকায়। সম্প্রতি তোলা
বাগান থেকে সংগ্রহ করা আনারস স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি রাঙামাটির নানিয়ারচরের ধার্যেছড়ি এলাকায়। সম্প্রতি তোলা

রাঙামাটির সুস্বাদ আনারস যাচ্ছে দেশজুড়ে, কেন এত কদর

আনারসভর্তি প্রায় অর্ধশত নৌযান। তা নোঙর করা আছে ঘাটে। অদূরে সারি সারি পিকআপ ভ্যান, ট্রাকেও বোঝাই করা হয়েছে আনারস। পাইকারেরা দরদাম করে আনারস কিনে নিচ্ছেন। এরপর নিয়ে যাচ্ছেন দেশের নানা প্রান্তে। রাঙামাটির বনরূপা বাজার এলাকায় এই চিত্র প্রায় প্রতিদিনের।

রাঙামাটির আনারসের খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। জেলায় চাষ হওয়া রসালো ও মিষ্টি স্বাদের এই আনারস চাষিদের কাছ থেকে কিনে দেশের নানা স্থানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন পাইকারেরা। দেশজুড়ে চাহিদা থাকার কারণে রাঙামাটিতে আনারস চাষও দিন দিন বাড়ছে। জেলায় পাহাড়ের ঢালজুড়ে এখন সারি সারি আনারসের বাগান।

রাঙামাটির আনারস বেশ মিষ্টি ও রসালো। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কুমিল্লায় এর অনেক চাহিদা। আমরা চাষিদের কাছ থেকে কিনে ট্রাকে করে ঢাকার আড়তগুলোতে পাঠাই।
মো. করিম, পাইকার, বনরূপা বাজার, রাঙামাটি

রাঙামাটির কুতুকছড়ি ধাজ্জ্যছড়ি এলাকার সুলক চাকমা পাঁচ বছর ধরে আনারসের চাষ করছেন। তিনি বলেন, ‘গত বছর ১০ হাজার চারা লাগিয়েছিলাম। দেড় লাখ টাকা আয় হয়েছে। এবার ১৫ হাজার চারা লাগিয়েছি। দুই লাখের বেশি আয় হবে বলে আশা করছি।’

বরকল উপজেলার নোয়াপাড়ায় আনারসের বাগান রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা রনি দেওয়ানের। তিনি বলেন, ‘আমি দুই একর জমিতে ২০ হাজারের মতো আনারসের চারা লাগিয়েছি। আশা করি, বিক্রি করে ভালোই লাভ হবে।’

গত শনিবার রাঙামাটির বনরূপা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আনারসের ক্রেতা-বিক্রেতায় সরগরম বাজার। পাইকারদের ছাড়াও খুচরায় অনেকেই আনারস বিক্রি করছেন। তাঁদের একজন শান্তি চাকমা। তিনি বলেন, বড় আনারস জোড়া ১২০ টাকা, মাঝারি ৮০ টাকায় বিক্রি করছেন। এবার ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

রাঙামাটিতে হানি কুইন জাতের আনারসের ফলন হয়েছে বেশ। সম্প্রতি রাঙামাটির নানিয়ারচরের ধার্যেছড়ি এলাকায়

বাজারে আনারস কিনতে আসা পাইকার মো. করিম বলেন, ‘রাঙামাটির আনারস বেশ মিষ্টি ও রসালো। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কুমিল্লায় এর অনেক চাহিদা। আমরা চাষিদের কাছ থেকে কিনে ট্রাকে করে ঢাকার আড়তগুলোতে পাঠাই।’

বনরূপা বাজারের মতো সকাল থেকেই বাগান থেকে আনারসের বেচাবিক্রি চলে জেলার কুতুকছড়ি, বরকল, সদর উপজেলার দিগিলীবাগ, নানিয়ারচর, বন্দুকভাঙ্গা, কাপ্তাইসহ নানা এলাকায়। আনারস চাষে বদলে গেছে এলাকার অনেক চাষির ভাগ্য।

জেলার নানিয়ারচর উপজেলার কলকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুমিতা চাকমা বলেন, তাঁরা স্বামী মিলে আনারস চাষ করেই সংসারের খরচাপাতি চালাচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়ার খরচ জোগাড় হয় আনারসের বাগান থেকেই।

নানিয়ারচরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন মিয়া বলেন, এক একর জমিতে আনারসের ১৫-১৭ হাজার চারা লাগানো যায়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি একরে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাভ থাকে। এ কারণে উপজেলায় আনারস চাষে আগ্রহ বেশি।

জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ফলন ধরা হয়েছে ৩৪ মেট্রিক টন। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ৯০ হাজার ৪৩৯ মেট্রিক টন আনারস।

উৎপাদন বেড়েছে ২৫ হাজার মেট্রিক টন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাঙামাটি কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ফলন ধরা হয়েছে ৩৪ মেট্রিক টন। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ৯০ হাজার ৪৩৯ মেট্রিক টন আনারস। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় আনারস চাষ করা হয়েছিল ২ হাজার ৫৩৭ হেক্টর জমিতে। প্রতি হেক্টরে ফলন হয় ২৫ দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন আনারস। মোট উৎপাদন হয়েছিল ৬৫ হাজার ৫৭৪ মেট্রিক টন আনারস। অর্থাৎ এবার উৎপাদন ২৪ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন বেড়েছে।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, রাঙামাটির আনারস মিষ্টি হওয়ার কারণে দেশজুড়ে এর বেশ চাহিদা রয়েছে। এখানকার লাল মাটি ও পাহাড়ি ঢাল আনারস চাষের বেশ উপযোগী। তা ছাড়া আনারস চাষে কম খরচে লাভ বেশি হয়। যার কারণে চাষিরা আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।