কেশবপুরে নিজের মাছের হ্যাচারিতে মাছকে খাবার দিচ্ছেন শৌখিন মাছচাষি আবদুল্লাহ। সম্প্রতি উপজেলার মাগুরখালী গ্রামে আবদুল্লাহর বাড়িতে
কেশবপুরে নিজের মাছের হ্যাচারিতে মাছকে খাবার দিচ্ছেন শৌখিন মাছচাষি আবদুল্লাহ। সম্প্রতি উপজেলার মাগুরখালী গ্রামে আবদুল্লাহর বাড়িতে

পড়েন মাদ্রাসায়, ৪০ টাকার দুটি মাছ থেকে গড়েছেন ৩০ লাখের হ্যাচারি

বন্ধুর বাড়ির ছোট্ট অ্যাকুয়ারিয়ামে রঙিন মাছ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন আবদুল্লাহ। ৪০ টাকা দিয়ে দুটি মাছ কিনে বাড়িতে এনে পরিচর্যা শুরু করেন। এরপর আট বছরের পথচলায় দুটি মাছ দিয়ে ৩০ লাখ টাকার পুঁজি গড়ে তুলেছেন তিনি। বাড়ির উঠানের পাশে ৬০টি চৌবাচ্চা ও একটি পুকুরে ৩০ ধরনের শৌখিন মাছ চাষ করছেন তিনি। তাঁর হ্যাচারির মাছ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

আবদুল্লাহ (২২) যশোরের কেশবপুর উপজেলার মাগুরখালী গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে। কেশবপুর বাহারুল উলুম কামিল মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের এই ছাত্র পড়ালেখার পাশাপাশি চার বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে শৌখিন মাছ চাষ করছেন। এখন তিনি বড় একটি হ্যাচারির মালিক। তাঁর হ্যাচারিতে ফাইটার ফিশ, গোল্ডফিশ, কমেট, কই কাপ, গাপ্পি, মলি শর্ট টেল, এঞ্জেল ফিশ, অরেঞ্জ মলি, ব্ল্যাক মলি, হোয়াইট মলিসহ ৩০ ধরনের মাছ আছে।

৪০ টাকার মাছ দিয়ে শুরু

আট বছর আগে এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন আবদুল্লাহ। বন্ধুর ছোট্ট অ্যাকুয়ারিয়ামে রঙিন মাছ দেখে তাঁর ভালো লেগে যায়। সেখান থেকে দুটি মাছ ৪০ টাকা দিয়ে কিনে বাড়িতে এনে একটি কৌটায় ছেড়ে দেন তিনি। সেই মাছ পরিচর্যা করার পর আরও কয়েকটি মাছ তৈরি হয়। সেখান থেকে উৎসাহ পেয়ে তিনি রঙিন মাছ চাষ শুরু করেন। চার বছর ধরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে শৌখিন মাছ চাষ করছেন।

বাড়ির উঠানের পাশেই ৬০টি চৌবাচ্চা ও একটি পুকুরে জাল দিয়ে ঘিরে মাছ চাষ করছেন আবদুল্লাহ। চৌবাচ্চাগুলোতে মাছ চাষের সহায়ক শেওলা দেওয়া হয়েছে। খাবার হিসেবে বাজার থেকে সংগ্রহ করা খাবার এবং জীবন্ত ‘টিউবিফেক্স’ পোকা চাষ করে ডিম ফুটিয়ে ব্যবহার করা হয়। গত সোমবার আবদুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানের পাশে একটি জায়গায় ছোট ছোট চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চায় রঙিন মাছ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। খাবার দিলেই সব এক জায়গায় ছুটে আসে।

আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, চৌবাচ্চায় মাছ চাষের উপযোগী শেওলা দেওয়া হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক অক্সিজেন দেওয়া হয়। কোনোটায় ছোট মাছ তৈরি হচ্ছে, কোনোটায় বিক্রির জন্য মাছ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখার জন্য এই মাছ অনেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার পাইকারি হিসেবেও কিনে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী মুঠোফোনে মাছের চাহিদা জানান। সেই অনুযায়ী মাছ দূরপাল্লার বাসে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাঁরা বিকাশের মাধ্যমে টাকা দিয়ে দেন।

কেশবপুরের শৌখিন মাছচাষি আবদুল্লাহর হ্যাচারির রঙিন মাছ। সম্প্রতি উপজেলার মাগুরখালী গ্রামে আবদুল্লাহর বাড়িতে

শুরুতে আগ্রহ দেখায়নি পরিবার

আবদুল্লাহ জানান, শৌখিন মাছ চাষ করার কথা পরিবারকে জানালেও প্রথমে কেউ আগ্রহ দেখাননি। সবাই না করে দেয়। কিন্তু তিনি কারও কথা না শুনে এক প্রকার জেদের বসেই মাছ চাষ শুরু করে দেন। প্রতিবেশীরা বিষয়টিকে পাগলামি হিসেবে দেখতেন। নিজের দাদা বলতেন, ‘যে মাছ খাওয়া যায় না, তা চাষ করে কী হবে? এতে কী পেট চলবে? এখন মা–বাবা, ভাইসহ সবাই তাঁর হ্যাচারিতে সহায়তা করেন।

সবার ধারণা, মিথ্যা প্রমাণ করে তিনি এখন সফল শৌখিন মাছচাষি বলে জানান আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, গত চার বছর বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করে তাঁর প্রায় ৩০ লাখ টাকা পুঁজি হয়েছে। এটিকে নিজের ভবিষ্যৎ জীবনের অন্যতম অবলম্বন বানাতে চান তিনি।

আবদুল্লাহর বাবা হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম প্রথম ছেলের এই মাছের চাষ দেখে আমরা তাকে বাধা দিয়েছি। পরে তার জোরাজুরিতে মত দিই। এখন হ্যাচারিতে অনেক মাছ আছে, তা থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভও আসছে।’ তিনি বলেন, ছেলের সাফল্য দেখে তাঁরাও ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

রঙিন মাছ চাষ করার জন্য বাড়ির উঠানের এক পাশে চৌবাচ্চা তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি কেশবপুরের মাগুরখালী গ্রামে আবদুল্লাহর বাড়িতে

মাছ যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়

আবদুল্লাহ জানান, তাঁর হ্যাচারির শৌখিন মাছ এখন নিয়মিত যশোর, সাতক্ষীরা, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাচ্ছে। তাঁর কাছ থেকে মাছ কিনে বাসাবাড়ির অ্যাকুয়ারিয়াম সাজাচ্ছে মানুষ। তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি, এই মাছ চাষ করে তিনি এমন সফলতা পাবেন।

আবদুল্লাহর হ্যাচারি থেকে বিভিন্ন ধরনের মাছ কেনেন রাজধানীর কাঁটাবনের অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আবদুল্লাহর হ্যাচারির মাছের গুণগত মান ভালো। উৎপাদনব্যবস্থায় অভিনবত্ব থাকায় তাঁর মাছগুলো স্থায়ী হয়।

খুলনার ফরাজীপাড়ার ফুল মার্কেটের মৎস্য ব্যবসায়ী আশীষ সরকার বলেন, আবদুল্লাহ লেখাপড়ার পাশাপাশি মাছ চাষ করে সফল হয়েছেন। তাঁর মাছের মান অনেক ভালো।

কেশবপুর উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল্লাহর মাছের হ্যাচারিটি প্রথম থেকেই তাঁরা তত্ত্বাবধান করে আসছেন। তিনি নিয়মিত মৎস্য বিভাগের পরামর্শ নেন। সে কারণেই তিনি এখন সফল মৎস্যচাষি ও উদ্যোক্তা। তাঁর হ্যাচারিকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে তাঁরা অন্যদের মাছ চাষে উৎসাহিত করছেন।