কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় জিলা স্কুল সড়ক এলাকার বধূয়া ফুড ভিলেজ এবারও শতাধিক ইফতার আইটেম নিয়ে হাজির হয়েছে। মানুষজন পছন্দের ইফতার কিনছেন। মঙ্গলবার বিকেলে তোলা
কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় জিলা স্কুল সড়ক এলাকার বধূয়া ফুড ভিলেজ এবারও শতাধিক ইফতার আইটেম নিয়ে হাজির হয়েছে। মানুষজন পছন্দের ইফতার কিনছেন। মঙ্গলবার বিকেলে তোলা

কুমিল্লার ইফতারির বাজারে বৈচিত্র্যময় ইফতারির সমাহার

কুমিল্লার মানুষের ইফতারির টেবিলে বদলে গেছে স্বাদ ও আয়োজনের ধরন। সেই পরিবর্তনের ছাপ দেখা যাচ্ছে এবারের রমজানের ইফতারির বাজারে। নগরের অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল—সবখানেই এখন দেশি খাবারের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান ও আফগান ঘরানার নানা পদ। ঐতিহ্যবাহী ছোলা-বেগুনির সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে বিরিয়ানি, কাবাব, পোলাও, রোস্টসহ নানা মুখরোচক খাবার।

রোজা শুরুর পর বিকেল গড়াতেই কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, টমছমব্রিজ, রাজগঞ্জ, রেসকোর্সসহ প্রতিটি এলাকা সরগরম থাকে। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের জন্য পছন্দের ইফতারি কিনতে ভিড় করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

নগরের কান্দিরপাড় জিলা স্কুল সড়ক এলাকার ‘বধূয়া ফুড ভিলেজ’ এবারও ইফতারির বাজারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরানি জিলাপি, গরুর মাংসের কাচ্চি বিরিয়ানি, খাসির রোস্ট, মাটির হাঁড়িতে রান্না করা গরুর মাংস, গরু ও খাসির মাংসের হালিম, খাসি কাবাব, তাওয়া ঝালফ্রাই, সোনালি মুরগি–ডিমসহ আফগানি দুরুস—সব মিলিয়ে ক্রেতাদের নজর কাড়ছে তাদের ব্যতিক্রমী আয়োজন। বিশেষ করে রেস্তোরাঁটির ইরানি জিলাপির সামনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে প্রতিদিনই। ঘি দিয়ে ভাজা প্রতি কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই জিলাপি এখন অনেক পরিবারের পছন্দের তালিকার শীর্ষে।

রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী ফুয়াদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ক্রেতাদের রুচি পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখেই প্রতিবছর নতুন পদ যুক্ত করা হচ্ছে। এখন মানুষ শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, নতুন স্বাদ উপভোগের জন্য ইফতারি কিনতে আসেন। তাই স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি পুরান ঢাকা ও বিদেশি স্বাদের আইটেমও রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ১০ টাকার সাধারণ ইফতারি থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম আইটেম—সব শ্রেণির ক্রেতার জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পরিবারের জন্য ইফতারি কিনতে আসা প্রবাসী কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আগে ইফতারি মানেই ছিল ছোলা, পেঁয়াজু আর বেগুনি। এখন পরিবারের সদস্যরা নতুন স্বাদের খাবার খেতে চান। কয়েক বছর ধরেই বাসার ইফতারিতে বধূয়া ফুড ভিলেজের মুখরোচক খাবার থাকছে। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সেভাবে ইফতারি তৈরি করছে।

সানজিদা আক্তার নামের এক তরুণী বলেন, ‘আগের তুলনায় মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। বাইরের বৈচিত্র্যময় খাবারে মানুষ বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। আমিও এসেছি মাংস দিয়ে তৈরি কয়েকটি ইফতারি আইটেম কিনতে।’

নগরের রাজগঞ্জ এলাকার ডায়ানা হোটেলের খাসির মাংসের হালিম এখনো জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে একই স্বাদ ধরে রাখায় রমজান এলেই হোটেলের সামনে ভিড় বাড়ে। হোটেলটির ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ১০০ কেজির বেশি হালিম বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। হালিমের বাইরে গত কয়েক বছরের মতো মাংসজাত খাবার ক্রেতারা বেশি কিনছেন ইফতারের জন্য।

ইরানি জিলাপির সামনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে প্রতিদিনই। ঘি দিয়ে ভাজা প্রতি কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই জিলাপি এখন অনেক পরিবারের পছন্দের তালিকার শীর্ষে

শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, নগরের প্রায় সব অভিজাত হোটেলই এবারের রমজানে বিশেষ ইফতারির আয়োজন করেছে। ঝাউতলার অ্যালিট প্যালেস, টমছমব্রিজ এলাকার হোটেল ওয়েসিস, কুমিল্লা ক্লাব, রেড রুফ ইন, সিটি পয়েন্ট কিংবা ছন্দু হোটেলসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বিকেলের পর উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। কান্দিরপাড় এলাকার লাহাম কিচেন প্রতি কেজি ৮০০ টাকায় ঝুরা গরুর মাংসের হালিম বিক্রি করছে।

কান্দিরপাড় এলাকার আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোজার সময় বিভিন্ন হোটেল ঘুরে নতুন খাবার খোঁজা যেন একধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে মানুষের। বিশেষ করে মাংসজাত খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। আমরাও কিনছি।’

কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ধনাঢ্য ও শিক্ষিত মানুষের শহর হওয়ায় কুমিল্লার ইফতারির ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। তিন-চার দশক আগে মানুষের ইফতারিতে মূল উপাদান ছিল দই, চিড়া, খই, মুড়ি কিংবা ছোলা, পেঁয়াজু ও বেগুনি। কিন্তু মানুষের রুচির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অবস্থার উত্তরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে কয়েক বছর ধরে নতুন নতুন খাবার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, আগে ইফতারিতে হয়তো এত প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু সন্তুষ্টি ছিল। এখন বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের দাপট বেড়েছে, কিন্তু সন্তুষ্টির জায়গাটি আগের মতো নেই।