
পাকা সড়কের পাশে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন বটগাছ। নিচে ঠেলাগাড়িতে সাজানো চায়ের কাপ। ট্রেতে মাখন ও চিনি মেশানো মুচমুচে গরম পোড়া রুটি। হাত বাড়িয়ে ক্রেতাদের হাতে গরম চা ও পোড়া রুটি তুলে দিচ্ছেন দোকানি মারুফ হোসেন (২৫)। ঠেলাগাড়ির পাশে দোলনা, কালভার্ট ও রেললাইনের ওপর বসে চায়ের কাপে গল্প জমে উঠছে বিভিন্ন বয়সী মানুষের।
এমন দৃশ্য দেখা গেল দিনাজপুরের বিরামপুর ও হাকিমপুর উপজেলার সংযোগস্থল ঢেলুপাড়া বটতলী এলাকায়। বটগাছের পাশ দিয়ে চলে গেছে বিরামপুর-হিলি আঞ্চলিক সড়ক।
হাকিমপুর উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া বাজারের বাসিন্দা মারুফ হোসেন গত ঈদুল ফিতরের দিন বিকেলে বটতলায় প্রথম শুরু করেন তাঁর ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান। এর পর থেকে চলছে তাঁর ব্যবসা। মারুফ জানান, তাঁর দোকানের নাম ‘টি অ্যান্ড টা’। এই নামে ফেসবুকে একটি পেজও খুলেছেন। সেখানে তিনি দুধ-চা ও পোড়া রুটির ভিডিও প্রচার করছেন। এর পর থেকে দোকানে বেড়েছে ক্রেতা। এখন প্রতিদিন বিরামপুর, হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ, ফুলবাড়ি, ঘোড়াঘাট, জয়পুরহাট ও নওগাঁ থেকে চাপ্রেমীরা দুধ-চায়ে চুমুক দিতে তাঁর দোকানে আসেন। তাঁদের কেউ আসেন পরিবার নিয়ে, আবার কেউ আসেন বন্ধুদের নিয়ে। প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। দুধ-চা ও পোড়া রুটির পাশাপাশি দোকানে পাওয়া যায় রং-চা, লেবু-চা, তুলসি-চা, মালাই-চা, তেঁতুল-চা ও গুড়ের চা। দোকানে পোড়া রুটি তৈরি ও পরিবেশনে সহযোগিতা করে তাঁর ছোট ভাই মাসুম হোসেন (১২)।
রোববার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, বটগাছের নিচের চায়ের দোকানটি। বটগাছের ডালে ঝুলছে দোলনা। দোকানসংলগ্ন যাত্রীছাউনি। দোকানের পেছনেই খাঁড়ি। খাঁড়ির ওপর একটি পুরোনো কালভার্ট। আর খাঁড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। মারুফের দোকান থেকে চা ও পোড়া রুটি নিয়ে কেউ বসছেন দোলনায়, কেউ কালভার্টে, কেউ-বা বসছেন যাত্রীছাউনিতে। কেউ আবার একটু নিরিবিলি গল্প করতে বসছেন রেললাইনের ওপর। খাঁড়ির পানিতে মাছ ধরতে মারুফ তাঁর দোকানে রেখেছেন হুইল বড়শি। ক্রেতারা চা ও পোড়া রুটি খেতে খেতে শখ করে বড়শি দিয়ে মাছও ধরছেন। কেউ দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিচ্ছেন। আবার কেউ মন চাইলে চায়ে চুমুক দিয়ে আবার নিজ গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন।
বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তরুণ অয়ন হাসান। তিনি বলেন, ‘আমি আশপাশের অনেক জায়গায় চা খাই। কিন্তু এখানকার চায়ের স্বাদ অন্য রকম, পরিবেশটাও অনেক সুন্দর। চায়ের সঙ্গে পোড়া রুটি খেতে অনেক ভালো লাগে। এখানকার আয়োজন অনেকটাই ব্যতিক্রমী।’
দোকানের পাশের রেললাইনের ওপর বসে দুধ-চা ও পোড়া রুটি খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলেন নওগাঁ থেকে আসা কয়েকজন নারী-পুরুষ। তাঁরা ফেসবুকে দুধ-চা ও পোড়া রুটির ভিডিও দেখেই প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূর থেকে এখানে এসেছেন বলে জানান।
বটতলায় আড্ডা দিচ্ছিল কয়েকজন কিশোর। তারা জানায়, প্রায়ই তারা ডাঙ্গাপাড়া বাজারে চা পান করে। মানুষের মুখে এই দোকানের কথা শুনে তারা এখানে চা পান করতে এসেছে।
উদ্যোক্তা মারুফ হোসেন বলেন, তাঁর এ দোকানটির বয়স মাত্র কয়েক মাস। জয়পুরহাট, পাঁচবিবি, ফুলবাড়ি ও ঘোড়াঘাটসহ দূরদূরান্ত থেকে অনেক লোকজন তাঁর দোকানে আসেন। দোকানে সাত রকমের চা ও পোড়া রুটি পাওয়া যায়। এখনকার প্রকৃতি তাঁর পছন্দ। মানুষ এখন শহরের কোলাহল থেকে একটু নিরিবিলি পছন্দ করে, এ জন্য তিনি এমন উদ্যোগ নিয়েছেন।