
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. ইকবাল হোসেনকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ন্যস্ত করার প্রজ্ঞাপন হয়েছে গতকাল রোববার সন্ধ্যায়। এর পর থেকে তাঁকে বহাল রাখা ও না রাখা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা–কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
উভয় পক্ষ বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। গতকাল রাত থেকে আজ সোমবার বিকেল চারটা পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরে ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এসব ঘটনা ঘটে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও চলছে পক্ষে বিপক্ষে পোস্ট–মন্তব্য।
জামায়াত, শিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতারা বলছেন, জেলা প্রশাসক মানবতার প্রশাসক। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করছেন। তাঁকে আজকের (সোমবার) মধ্যে বহাল রাখতে হবে। না তা হলে অসহযোগ আন্দোলন করা হবে। প্রশাসকের কার্যালয়ের তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সব কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
আর বিএনপি ও যুবদলের নেতারা বলছেন, সরকার কাকে প্রত্যাহার করবে না করবে, সেটা সরকারের বিষয়। জেলা প্রশাসকের বদলি ঠেকাতে তাঁর পক্ষ নিয়ে জামায়াত–শিবির ‘মব’ তৈরি করছে।
ডিসিকে বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলনকারীরা ‘জুলাই যোদ্ধা ও কুষ্টিয়া সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে আন্দোলন করেছেন। আর সরকারের প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনকারীরা ‘২৪ এর গণ–অভ্যুত্থানে আহত জুলাই যোদ্ধা অ্যাসোসিয়েশন ও সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে আন্দোলন করেছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া জেলাসহ দেশের পাঁচটি জেলার জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার প্রজ্ঞাপন হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাতে তাৎক্ষণিক কুষ্টিয়া শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়। জুলাই যোদ্ধা ও ছাত্র–জনতার ব্যানারে এই কর্মসূচিতে জামায়াতের কয়েকজন নেতা–কর্মীকে দেখা যায়। এরপর আজ সকাল ১০টার দিকে শহরের মজমপুর এলাকা থেকে আবারও বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন তাঁরা। সেখানে স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির সামনের জায়গায় বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেন।
বেলা একটার দিকে জেলা প্রশাসক মো. ইকবাল হোসেন তাঁর ব্যবহৃত সরকারি গাড়িতে চড়ে যেতে চাইলে আন্দোলনকারীরা তাঁর পথ আটকে দেন। তাঁরা তাঁকে বহাল রাখার দাবিতে বক্তব্য দিতে থাকেন। এ সময় গাড়ির ভেতর জেলা প্রশাসক বসে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি কাচ নামিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে হাত মেলান। এ সময় কেউ কেউ বলতে থাকেন, ‘আপনাকে কোনোভাবেই জেলা থেকে যেতে দেব না। আপনি থাকবেন। আপনি থাকলে জেলার দুর্নীতি দূর হবে। আপনি মানবতার ডিসি। আপনি চলে গেলে দুর্নীতিতে ছেয়ে যাবে।’ এ সময় জেলা প্রশাসক কোনো কথা বলেননি। প্রায় ৩০ মিনিট পর জেলা প্রশাসকের গাড়ির সামনে থেকে আন্দোলনকারীরা সরে যান। গাড়ি ছেউড়িয়ায় লালন একাডেমির দিকে চলে যায়।
দৌলতপুর উপজেলা যুব জামায়াতের সেক্রেটারি পরিচয় দিয়ে আন্দোলনকারী মোহাম্মদ উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল সাড়ে নয়টা থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। ডিসি স্যার থাকায় জেলাতে শান্তি রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁকে হারাব তা মানতে পারছি না। এ জন্য তাঁর প্রত্যাহার বাতিল চাচ্ছি।’
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাবেক মুখ্য সংগঠক ও সমন্বয়ক বেলাল হোসেন (বাঁধন)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুষ্টিয়ার সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছে। ছাত্র–জনতার দাবি সরকারকে পূর্ণ বিবেচনা করতে হবে। ডিসিকে বহাল রাখতে হবে। তা না হলে বৃহৎ জনমত গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে ডিসি অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেব। যেকোনো মূল্যে ডিসিকে রাখতে চাই। আরও কঠোর আন্দোলন করা হবে।’
বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপি যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা ‘কুষ্টিয়ায় মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, অবৈধ কর্মসূচির প্রতিবাদে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের রক্ষায়’ মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি করে। তাঁদের ব্যানারে লেখা ছিল, আয়োজনে ‘২৪ গণ–অভ্যুত্থানে আহত জুলাই যোদ্ধা অ্যাসোসিয়েশন ও সর্বস্তরের জনগণ।’ কুষ্টিয়া পৌরসভা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বের হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জড়ো হন তাঁরা।
আয়োজকরা জানান, গতকাল কুষ্টিয়ার ডিসি বদলি হওয়াকে কেন্দ্র করে মব সন্ত্রাস ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ এবং শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতে তাঁরা এই কর্মসূচির আয়োজন করেছেন। এ সময় সেখানে জেলা যুবদলের প্রধান সমন্বয়ক আবদুল মাজেদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতিসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সদর উপজেলার জিয়ারখী ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ডিসি আসছেন। সব জনগণের কাজ করবেন। কোন সময়ে তাঁকে বদলি করবে, সেটা সরকার করবে। কিন্তু জামায়াত–শিবির ডিসির পক্ষ নিয়ে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করছে। সন্ত্রাস জঙ্গিবাদের লোক ছাড়া ডিসিকে ঠেকানোর লোক নেই। জামায়াত–শিবিরের লোক কেন ডিসিকে ঠেকাচ্ছে?’
এদিকে গতকাল রাতে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে কারও নাম উল্লেখ না করে লেখেন, ‘এ দেশে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক মানুষের মূল্য নেই।’ অবশ্য কয়েকটি মিনিট পরেই পোস্টটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল তিনি সাড়া দেননি। তাঁর সঙ্গে থাকা তাঁর শ্যালক আবু বক্কর সিদ্দীক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্ট্যাটাসের সঙ্গে ডিসির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আর তিনি (আমির হামজা) কোনো কথাও বলতে চাচ্ছেন না। তারপরও আপনার (ফোন করার) বিষয়টি তাঁকে বলা হবে।’
অন্যদিকে গভীর রাতে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও কুষ্টিয়া-৩ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী জাকির হোসেনও কারও নাম উল্লেখ না করে লেখেন, ‘কুষ্টিয়ার একজন সরকারি কর্মকর্তার বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ মহলের অতিউৎসাহী ভূমিকার কারণ বুঝতে হলে, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার এবং আনসার সদস্যদের তালিকা পর্যালোচনা করতে হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু আর নাই–বা বললাম।’