ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা। ১২ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল-৮ আসনের সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের মহানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে
ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা। ১২ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল-৮ আসনের সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের মহানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে

টাঙ্গাইলের আট আসন

৩০ বছরের ব্যবধানে জামায়াতের ভোট বেড়েছে ২৪ শতাংশ, বিএনপির ১৫

৩০ বছরের ব্যবধানে টাঙ্গাইল জেলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ভোট বেড়েছে ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ সময়ে বিএনপির ভোট বেড়েছে ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার আটটি আসনে দল দুটির প্রাপ্ত ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত পৃথকভাবে অংশ নেয়। সেবার নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। বিগত নির্বাচনগুলোতে জেলার ভোটারদের বড় একটি অংশ দলটিকে ভোট দিয়ে আসছিল। নির্বাচনে ‘আওয়ামী লীগের ভোটারদের’ ভোট পাওয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে।

জেলা বিএনপির নেতাদের অভিমত, আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার জামায়াতকে ভোট দেওয়ায় তাদের ভোট বেড়েছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভোট নিয়েই বিএনপি নির্বাচিত হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত না করলে একাধিক আসনে পরাজিত হতো।

আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে ঠেলাঠেলি

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার আটটি আসনে মোট ভোটার ছিলেন ১৬ লাখ ২১ হাজার ৫৬৫ জন। এর মধ্যে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৬টি বৈধ ভোট পড়ে। এতে বিএনপি আটটি আসনে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৮৭ ভোট পায়, যা ছিল মোট বৈধ ভোটের ৩৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী আটটি আসনে মোট ভোট পেয়েছিল ২৪ হাজার ৭৩৫টি, যা মোট বৈধ ভোটের ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

৩০ বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জেলার আটটি আসনেই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ভোট বেড়েছে কয়েক গুণ। আটটি আসনে মোট ২০ লাখ ৩০ হাজার ২৪৩ বৈধ ভোট পড়ে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯ ভোট পায়, যা বৈধ ভোটের ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। একটি আসন (টাঙ্গাইল-৩) জামায়াত জোটের শরিক দল এনসিপিকে ছেড়ে দেয়।

অপর দিকে বিএনপি আটটি আসনে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৯৫৮ ভোট পায়, যা মোট বৈধ ভোটের ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এই ভোট পেয়ে বিএনপি আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে জয়লাভ করে।

আগামী নির্বাচনে টাঙ্গাইলে জামায়াতের ভোট আরও বাড়বে বলে মনে করেন দলটির জেলা আমির আহসান হাবীব (মাসুদ)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা টাঙ্গাইল জেলায় ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট থেকে ৩০ বছরের ব্যবধানে ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়েছি। আমাদের ভোট অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপির দিকে গেছে। তাই তাদের বিজয় হয়েছে।’

তবে ভবিষ্যতে জামায়াত তাদের এই ভোট ধরে রাখতে পারবে না বলে মনে করেন জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে জামায়াত বেশি ভোট পেয়েছে কারণ আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও তাদের অনেক ভোটার জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। তা ছাড়া এনসিপিসহ জামায়াতের জোটের শরিকদের কারণেও এ ভোট বেড়েছে।’

পাঁচটিতে দ্বিতীয়, তিনটিতে তৃতীয় জামায়াত

জেলার আটটি আসনের মধ্যে ভোটের হিসাবে পাঁচটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। তাঁরা হলেন টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে আবদুল্লাহেল কাফী, টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে হুমায়ুন কবীর, টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে আহসান হাবীব (মাসুদ), টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে এ কে এম আবদুল হামিদ ও টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন।

জমায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের প্রার্থীরা তিনটি আসনে তৃতীয় হয়েছেন। টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুর রাজ্জাক তৃতীয় অবস্থানে আছেন। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দ্বিতীয় হয়েছেন। টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনে জামায়াতের মো. শফিকুল ইসলাম খান তৃতীয় হয়েছেন। এ আসনে দ্বিতীয় হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর।

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনটি জোটভুক্ত এনসিপিকে দিয়েছিল জামায়াত। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম ওবায়দুল হককে (নাসির) পরাজিত করে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী লুৎফর রহমান খান নির্বাচিত হয়েছেন। এনসিপির প্রার্থী সাইফুল্লাহ হায়দার তৃতীয় হয়েছেন।

তিন আসনে ৮০ থেকে ৯০ হাজারের বেশি ভোট

জামায়াত কোনো আসনে জয়ী হতে না পারলেও তিনটি আসনে ৮০ থেকে ৯০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছে। টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে এবার নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল্লাহেল কাফী ৯৪ হাজার ৪৬২ ভোট পেয়েছেন। তিনি মোট বৈধ ভোটের ৩৩ দশমিক ৪২ শতাংশ পান। বিএনপির ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩২ ভোট পেয়ে আসনটিতে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মজিবর রহমান মাত্র ৪ হাজার ১৭০ ভোট পেয়েছিলেন।

টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে এবার জামায়াতের প্রার্থী সংগঠনের জেলা আমির আহসান হাবীব ৮০ হাজার ২৮৩ ভোট পেয়েছেন, যা মোট বৈধ ভোটের ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বিএনপির প্রার্থী সুলতান সালাউদ্দিন (টুকু) ১ লাখ ৩১ হাজার ২৭৯ ভোট পেয়ে এখানে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী শফিকুর রহমান এখানে মাত্র ৩ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়েছিলেন।

টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম আবদুল হামিদ মাত্র ১ হাজার ৬৭৬ ভোট পেয়েছিলেন। এবার তিনি জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ৯১ হাজার ৯১৪ ভোট পেয়েছেন, যা মোট বৈধ ভোটের ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ। বিএনপির মো. রবিউল আওয়াল দেড় লাখ ভোট পেয়ে আসনটিতে জয়ী হয়েছেন।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অনীক রহমান (বুলবুল) প্রথম আলোকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী ভেতরে ভেতরে দল গুছিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের সুফল তারা নিয়েছে। তা ছাড়া ধর্মীয় আবেগ–অনুভূতি কাজে লাগিয়ে এবার নির্বাচনে ভালো ফল করেছে। বিএনপির সামনে এবার একটি পরীক্ষা। যদি তারা সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়, তাহলে জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলা করতে পারবে। বিএনপি ব্যর্থ হলে সামনে জামায়াতের ভোট আরও বাড়বে।