
ঈদুল ফিতরের দিন সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। বৈরী আবহাওয়ায় ঈদের নামাজ মসজিদে নাকি ঈদগাহে হবে, এ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে অন্তত ১৩ জন আহত হন। পণ্ড হয়ে যায় ঈদের নামাজ। এ ঘটনার পর বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
আহত ব্যক্তিরা হলেন চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামের রুবেল হোসেন (৩০), গফুর (৪০), আলম ( ৪৫), শাকিল (২৫), রিপন (২৬), সরোয়ার (৪৫), আশরাফুল (৩৫), শাহিন (৩৫), জিয়া (৩৭), মুসা (৪৫), মন্টু প্রামাণিক (৫৫), জুয়েল (২৭) ও ফিরোজা খাতুন (৩৩)। তাঁদের কয়েকজনকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গড়াই নদের চরে অবস্থিত ওই চর এলঙ্গী আচার্য গ্রাম। সেখানে অন্তত ১২০টি পরিবারে পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস। সেখানে নামাজের জন্য একটি জামে মসজিদ ও একটি ঈদগাহ মাঠ রয়েছে। শনিবার সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে ঈদগাহ কমিটি পূর্বঘোষিত সকাল সাড়ে আটটার পরিবর্তে ঈদের জামাত সাড়ে নয়টায় নির্ধারণ করে। এ নিয়ে গ্রামবাসী দুই ভাগে বিভিক্ত হয়ে যায়। স্থানীয় মন্টু প্রামাণিকের নেতৃত্বে চর এলঙ্গী আচার্য জামে মসজিদে গ্রামের একাংশের মানুষ নামাজ শুরু করেন। এরপর ঈদগাহ কমিটির পক্ষ থেকে আলম, গফুর, শাকিলসহ কয়েকজন প্রতিপক্ষের লোকদের ঈদগাহে আসার আহ্বান করেন। এ সময় তাঁদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার জেরে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় মন্টু প্রামাণিকের পক্ষের কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় গ্রামের অন্তত চার ভাগের তিন ভাগ মানুষ এবার ঈদের নামাজ পড়তে পারেননি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
আজ দুপুরে কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বারান্দায় আহত রুবেল, জুয়েল, মন্টু প্রামাণিক ও ফিরোজা খাতুন চিকিৎসাধীন। তাঁদের হাতে, মুখে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
আহত রুবেল বলেন, সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল। এক পক্ষ বলে মসজিদে নামাজ হবে, আরেক পক্ষ বলে ঈদগাহ মাঠে। এ নিয়ে তর্কাতর্কি করতে করতে মারামারি শুরু হয়ে যায়। মারামারি ঠেকাতে গেলে তাঁর মাথায় জুয়েল, মন্টু, মুসাসহ ১০-১২ জন কাঠের বাটাম ও বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। চিকিৎসক তাঁর মাথায় আটটি সেলাই দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়ে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন। তাঁদের লোকজন ঈদের নামাজ পড়তে পারেননি।
অভিযোগ অস্বীকার করে আহত জুয়েল বলেন, বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ হয়। নামাজ শেষে খুতবা চলছিল। এ সময় আলম, শহিদসহ কয়েকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করেন। এতে তিনি, তাঁর বাবাসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া তাঁদের পক্ষের কিছু বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ তোলেন তিনি।
বিকেলে চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এলাকায় থমথমে পরিবেশ। আহত মন্টু প্রামাণিক, জুয়েলসহ কয়েকজনের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এ সময় জুয়েলের ভাবি রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘ঈদের নামাজ পড়া নিয়ে রাস্তায় মারামারি হয়ছিল। আর ওরা এসে আমারে বাড়িতে ভাঙচুর করে লুট করে নিয়ে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রহমানের মা ছারা খাতুন বলেন, ‘এরশেদ, আলম, সাইফুল এসে আমার ছেলের অটোগাড়ি ও বাড়ি ভেঙে চুরমার করে দিছে। আমরা এর বিচার চাই।’
গ্রামবাসীর সংঘর্ষের কারণে এবার ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে পারেননি এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, সকালে বৈরী আবহাওয়া ছিল। সংঘর্ষের কারণে আর নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। এবার নামাজও পড়া হয়নি।
চর এলঙ্গী আচার্য ঈদগাহ ময়দানের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রায় ৫০০ মানুষের বসবাস গ্রামটিতে। সংঘর্ষে বেশির ভাগ মানুষ এবার নামাজ পড়তে পারেননি। সংঘর্ষ আর হামলার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, ঈদের নামাজের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।