
দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়া উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন। জীবিকার তাগিদে প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় আসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানেই গড়ে উঠেছে তাঁর সংসার, এখানেই সন্তানের স্কুল, এখানকার ঠিকানাতেই তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র।
আজ রোববার বিকেলে জসিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় টঙ্গীর কলেজ গেট এলাকায়। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ভোটটা দেওয়া আমাদের অধিকার। আমরা তো এখানেই থাকি, এখানেই কাজ করি। কে আমাদের কথা বুঝবে, সেটা তো ভোট দিয়েই জানাতে হবে। তাই কারখানা যেহেতু ছুটি থাকবে, তাই সকাল সকালেই ভোটটা দিতে চাই।’ ভোট কাকে দেবেন, এমন প্রশ্নে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ভোটটা তাঁকেই দেব, যিনি শ্রমিকদের জন্য চিন্তা করেন বা শ্রমিকদের পাশে থাকার কথা দিবেন।’
জসিম উদ্দিন একা নন। গাজীপুরের হাজারো শিল্পকারখানায় কর্মরত লাখো শ্রমিকের গল্প প্রায় একই রকম। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাজের সূত্রে এসে তাঁরা আজ গাজীপুরের ভোটার। আর সেই শ্রমিক ভোটাররাই এবার গাজীপুরের নির্বাচনী সমীকরণে সবচেয়ে বড় ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠছেন।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুরে সংসদীয় আসন পাঁচটি। এর মধ্যে গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর–সিটির একাংশ), গাজীপুর-২ (গাজীপুর মহানগর ও টঙ্গী) ও গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও সদর একাংশ) এই তিনটি সংসদীয় আসনজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকস–সহ নানা ধরনের শিল্পকারখানা। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়েছে বহু আগেই। কর্মসংস্থানের সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব শ্রমিকের একটি বড় অংশ এখন গাজীপুরের ভোটার।
কয়েকজন শ্রমিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর সদর, টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, শ্রীপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শিল্পকারখানার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের কারণে নারী শ্রমিকের সংখ্যা এখানে উল্লেখযোগ্য। দিনের বড় একটি সময় কারখানায় কাটালেও এসব শ্রমিক স্থানীয় বাজার, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে তাঁরা শুধু কর্মজীবী জনগোষ্ঠীই নন, বরং স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক সচেতনতা ক্রমেই বাড়ছে। আগের মতো তাঁরা আর কেবল ভাসমান ভোটার নন, বরং অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করে গাজীপুরের ভোটার হয়েছেন। এর ফলে শিল্পঘন তিনটি নির্বাচনী আসনেই ভোটারসংখ্যায় শ্রমিকদের অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন মো. শামীম হোসেন। তিনি কাজ করেন দিগন্ত সোয়েটার কারখানায়। শামিম বলেন, ‘দীর্ঘদিন করে কাজের কারণে এখানেই ভোটার হয়েছি। আমার স্ত্রীও গাজীপুরের ভোটার। তাই আমরা এখন এখানেই ভোট দেব। ভোটের পরিবেশটা যেন ঠিক থাকে। ভোট দিতে গিয়ে যেন কোনো ঝামেলায় পড়তে না হয়। সুষ্ঠু ভোটই আমাদের কাম্য।’
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুরের শিল্পঘন তিনটি আসনেই প্রার্থীদের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। প্রচলিত গণসংযোগের পাশাপাশি এবার একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা হলো, প্রার্থীরা সরাসরি শিল্পকারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাঁদের সমস্যা ও দাবি শুনছেন, এমনকি কারখানার আশপাশের এলাকায় বিশেষভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
আজ রোববার সকালে গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর ও সিটির একাংশ) আসনের বিএনপির প্রার্থী কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র মজিবুর রহমান সকালে উপজেলার নীট এশিয়া লিমিটেড কারখানায় নারী-পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন। এরপর তিনি নীট মোয়াজউদ্দিন টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা, লিডা গ্রুপের কারখানাসহ অন্তত ১২টি কারখানায় শ্রমিকদের কাছে দোয়া ও ভোট প্রার্থনা করেন।
এ সময় কারখানার শ্রমিকদের ‘ভোটব্যাংক’ উল্লেখ করে মজিবুর রহমান বলেন, ‘পৌর নির্বাচনের সময় থেকে কারখানা শ্রমিকেরা আমাকে ভোট দিয়ে আসছেন। তাই আশা করছি, এবারও তাঁরা আমাকে ভোট দেবেন।’
গাজীপুর-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী শাহ্ আলম বকশি বলেন, গাজীপুর শিল্পপ্রধান এলাকা হওয়ায় এখানে লাখ লাখ শ্রমিকের বসবাস। এই শ্রমিকদের বড় একটি অংশই এ আসনের ভোটার। ফলে নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে শ্রমিক ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
গাজীপুর-২ আসনের এনসিপির প্রার্থী আলী নাছের খান বলেন, শিল্পকারখানার শ্রমিকদের একটি বড় অংশ তাঁদের পক্ষে রয়েছে। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তাঁরা শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন।
কারখানাশ্রমিক মো. হোসেন আলী বলেন, ‘বিপদে আপদে এবং শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যিনি সহযোগিতা করার কথা দেবেন, তাঁকেই ভোট দেব।’
এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিল্প–অধ্যুষিত গাজীপুরের তিনটি আসনে অতীতে বিজয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত শ্রমিকেরা ফলাফল বদলে দিতে সক্ষম। শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বা প্রতীকের পক্ষে ঝুঁকে গেলে অন্য সব সমীকরণকে ছাপিয়ে যেতে পারে।
একই রকম ভাষ্য জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামানের। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গাজীপুর শিল্প–অধ্যুষিত এলাকা। তাই এখানে বহিরাগত শ্রমিক ভোটার প্রচুর আছেন। শ্রমিকের ভোট যাঁর ব্যালটে যাবে, সেই প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। তাই প্রার্থীদের কাছে শ্রমিক ভোটাররা গুরুত্ব বেশি পাচ্ছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর এলাকায় শ্রমিক ভোটাররাই মূলত জয়ের মূল চাবিকাঠি বা ‘নির্ধারক ফ্যাক্টর’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এর মূলে প্রধান কারণ তিনটি—বিশাল সংখ্যার ভোটব্যাংক, ফলাফল পরিবর্তনের ক্ষমতা এবং তরুণ ও নারী ভোটার। তাই এবার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা তাঁদের ইশতেহারে শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও আবাসন নিয়ে বড় ধরনের আশ্বাস দিয়েছেন, যা অতীতের কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি। তবে প্রার্থীদের এই আশ্বাস ভোটের রাজনীতি নাকি পরিবর্তনের অঙ্গীকার, সেটি ভবিষ্যৎই বলে দেবে।